নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশব্যাপী গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নির্বাচন বানচালের যেকোনো অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাস্তাঘাট অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।
সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৯তম সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, সভায় দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার অগ্রগতি, অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২, অবৈধ ও লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, মাদকবিরোধী অভিযান, সীমান্ত ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছি।”
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। সব বাহিনীর গোয়েন্দা তথ্য ও উপাত্ত সমন্বয়ের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয়, তৎপর ও সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সভায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের দ্রুত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করার বিষয়েও আলোচনা হয়। নির্বাচনী প্রচার ও রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকে, সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সবাইকে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আগামী ৭ জানুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। তিনি জানান, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আরও বলেন, সহযোগীর ছদ্মবেশে ফ্যাসিস্টের এজেন্ট বা নাশকতাকারীরা যেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে অনুপ্রবেশ ঘটাতে না পারে, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দোষারোপের সুযোগ নিয়ে যাতে নাশকতাকারীরা পার পেয়ে না যায়, সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ প্রসঙ্গে তিনি জানান, গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে রোববার পর্যন্ত এই অভিযানে ১৪ হাজার ৫৬৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা ও পরোয়ানাভুক্ত আসামিসহ মোট গ্রেপ্তার ৩৩ হাজার ৮০৪ জন। অভিযানে ২০১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ১ হাজার ৫৪১টি গুলি, ৫৬৬টি কার্তুজ ও ১৬৫টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সভায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার ও উসকানিমূলক বক্তব্য প্রতিরোধ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয় বলে জানান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।