দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে হামলার চেষ্টা নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রেসনোট পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে ঢাকা। রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে ভারতের বক্তব্যের জবাবে এ অবস্থান জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, দিল্লিতে অবস্থানরত বাংলাদেশি হাইকমিশনারের পরিবার বর্তমানে হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে হুমকির বিষয়টি তারা শুনেছেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন কূটনৈতিক এলাকার গভীর অংশে অবস্থিত। এটি কূটনৈতিক এলাকার বাইরের অংশে বা প্রান্তে নয়। সে ক্ষেত্রে ২৫ জনের একটি চরমপন্থী গোষ্ঠীর সদস্য কীভাবে এত ভেতরে প্রবেশ করতে পারে, সেটাই প্রশ্ন। এর অর্থ হলো, তাদের সেখানে পৌঁছাতে দেওয়া হয়েছে। তারা এসে শুধু একজন হিন্দু নাগরিক হত্যার প্রতিবাদই করেনি, বরং আরও নানা বক্তব্য দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা প্রশ্নকে জড়িয়ে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। নিহত ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক এবং বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই ঘটে এমন নয়, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে।
বাংলাদেশি কূটনীতিকদের নিরাপত্তা জোরদার করা প্রয়োজন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রয়োজন হলে অবশ্যই নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। তিনি বলেন, বিষয়টি কেবল স্লোগান দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওই ভবনে একটি পরিবার বসবাস করে, যারা আতঙ্কিত হয়েছে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের দায়িত্ব বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা দিন দিন বাড়ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। গত ২০ ডিসেম্বর রাতে নজিরবিহীনভাবে দিল্লিস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের গেট পর্যন্ত পৌঁছে যায় উগ্রপন্থী বিক্ষোভকারীরা। তারা নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে চ্যান্সারি গেটে গিয়ে বিক্ষোভ করে এবং বাংলাদেশি দূতকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ ও হুমকি দেয়। ‘অখণ্ড হিন্দু রাষ্ট্রসেনা’ ব্যানারে একদল উগ্রপন্থী বাংলাদেশ মিশনের মূল ফটকের বিপরীতে অবস্থান নেয়। এ সময় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো বাধা দেওয়া হয়নি। তারা গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশবিরোধী নানা স্লোগান দেয়।
এ বিষয়ে ভারত সরকার ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরে। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে বিক্ষোভকারীদের উপস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে ‘বিভ্রান্তিকর প্রচারণা’ বলে দাবি করে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এক বিবৃতিতে বলেন, ২০ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সামনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন যুবক জড়ো হয়েছিল। তারা ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছিল এবং বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি তুলছিল।
রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেন, বিক্ষোভকারীরা হাইকমিশনের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা করেনি এবং কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকিও তৈরি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ভারত বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে ভারতের উদ্বেগও জানানো হয়েছে। তিনি পুনরায় উল্লেখ করেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী ভারতের ভূখণ্ডে অবস্থিত সব বিদেশি মিশন ও কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নয়াদিল্লি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের গেটে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশের প্রেস মিনিস্টার মো. ফয়সাল মাহমুদ জানান, শনিবার রাত সাড়ে ৮টা থেকে পৌনে ৯টার মধ্যে তিনটি গাড়িতে করে কয়েকজন ব্যক্তি বাংলাদেশ ভবনের গেটে এসে কিছুক্ষণ চিৎকার করে। তারা বাংলা ও হিন্দি ভাষায় হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হাইকমিশনারকে ধরার কথা বলে স্লোগান দেয়। পরে তারা মূল ফটকের সামনে কিছুক্ষণ অবস্থান করে চিৎকার করে সেখান থেকে চলে যায়।