শেকৃবি প্রতিনিধি
আজ ২৬ অক্টোবর, বাংলার বাঘ নামে খ্যাত শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের জন্মদিন। ১৮৭৩ সালের এই দিনে বরিশাল জেলার সাতুরিয়া গ্রামে জন্ম নেন তিনি। রাজনীতি, শিক্ষা, কৃষি ও সমাজকল্যাণে তাঁর অসামান্য অবদান তাঁকে ইতিহাসের অবিনাশী স্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
শেরে বাংলার ছাত্রজীবন ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে গণিত, পদার্থ ও রসায়নে অনার্সসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আইনশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবন শুরু করেন একজন দক্ষ আইনজীবী হিসেবে, তবে তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের মুক্তি। সেই লক্ষ্যেই তিনি পা রাখেন রাজনীতির মঞ্চে।
বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী ও দরিদ্র জনগণের উন্নয়ন ছিল তাঁর রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন—দেশের মাটির মানুষই জাতির মেরুদণ্ড। কৃষকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, ঋণমুক্তি এবং ফসলের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে তিনি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেন।
কৃষি শিক্ষার উন্নয়নেও শেরে বাংলার ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়াতে তিনি বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করেন। তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ১৯৩৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় “The Bengal Agricultural Institute”, যা পরবর্তীতে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি) নামে রূপান্তরিত হয়। আজও এই প্রতিষ্ঠান দেশের কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার অগ্রযাত্রায় পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।
১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ সরকারের প্রণীত “Agricultural Education Scheme” বাস্তবায়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর চিন্তা ছিল—প্রতিটি অঞ্চলের কৃষি সমস্যা বোঝার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা। আজকের শেকৃবি তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তব রূপ, যা দেশের কৃষিক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখছে।
শেরে বাংলার রাজনৈতিক জীবনও সমানভাবে উজ্জ্বল। তিনি বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে জনগণের কল্যাণে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। ‘লাহোর প্রস্তাব’-এর অন্যতম প্রণেতা হিসেবে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে বিশেষ স্থান দখল করেন। তবে তাঁর দৃষ্টি সর্বদা ছিল মানবিক—শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষি উন্নয়ন ছিল তাঁর নীতির কেন্দ্রবিন্দু।
তাঁর আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। তিনি বলতেন, “যে জাতি কৃষককে সম্মান দেয়, সে জাতিই অগ্রসর হয়।” এই দর্শন আজও বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়নের মূল অনুপ্রেরণা।
আজ শেরে বাংলার জন্মদিনে জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে সেই মহান নেতাকে, যিনি রাজনীতি, শিক্ষা ও কৃষিকে একসূত্রে গাঁথে দিয়েছিলেন। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি গাছ, শ্রেণিকক্ষ ও গবেষণাগার যেন আজও তাঁর প্রজ্ঞার সাক্ষী হয়ে আছে “বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ—এই দুই-ই আমার জীবনের মূল প্রেরণা।”