প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল বুধবার দল দুটির প্রতিনিধিরা পৃথকভাবে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। গতকাল সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে জামায়াতের পক্ষে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।
প্রতিনিধিদলে ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম মাসুম ও রফিকুল ইসলাম খান। এর আগে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে চার সদস্যের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম ও দলের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ।
প্রেস ব্রিফিংয়ে যা জানিয়েছে এনসিপি : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই সনদে স্বাক্ষরের আগে আমরা এর বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাই।
সনদের মাধ্যমে আমরা আমাদের অবস্থান সরকারের কাছে তুলে ধরেছি, তবে কেবল কাগজে-কলমে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে এনসিপি বিশ্বাস করে না। বাস্তবে কিভাবে তা কার্যকর হবে—সে বিষয়ে স্পষ্ট নিশ্চয়তা মিললেই আমরা স্বাক্ষর করব। বিষয়টি প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি।’
তিন দফা দাবির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “আমাদের দাবিগুলো হচ্ছে—জুলাই সনদের আদেশ কেবল ড. মুহাম্মদ ইউনূসই জারি করবেন; ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর কোনো কার্যকারিতা থাকবে না; এবং জুলাই সনদের বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হবে গণভোটের মাধ্যমে।
এই তিনটি দাবি বিবেচনায় নিলে এনসিপি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে।” তিনি আরো জানান, জুলাই সনদে প্রস্তাবিত বিষয়গুলো ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে বিবেচনা করা হবে বলে প্রধান উপদেষ্টা আশ্বাস দিয়েছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আলোচনা হবে গণভোটের পর, তার আগে নয়। কারণ তত্ত্বাবধায়ক সরকার জুলাই সনদের আওতাভুক্ত একটি বিষয়। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করতে হয়, তাহলে জুলাই সনদের ভিত্তিতেই নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। বিচারব্যবস্থার সংস্কার নিশ্চিত করে নির্বাচন আয়োজন করা অন্তর্বর্তী সরকারেরই দায়িত্ব।
নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছি। কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান কার্যক্রম আমাদের দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ মনে হচ্ছে না। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের যেভাবে কাজ করা উচিত ছিল, সেটি তারা করছে না। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন থাকা জরুরি।’ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন যদি সুষ্ঠুভাবে না হয়, তবে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তাবে। এ বিষয়ে আমরা সরকারকে অবহিত করেছি এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের কথা জানিয়েছি।’
দলীয় প্রতীক প্রসঙ্গে মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শাপলা প্রতীক ছাড়া আমরা অন্য প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নেব না। নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের প্রতীক নিয়ে স্পষ্ট কোনো আইনি ব্যাখ্যা না দিয়ে জোর করে অন্য প্রতীক চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে তাদের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে আমরা তা বিশ্বাস করি না। শাপলা না দেওয়ার আইনি ব্যাখা দিলে অন্য প্রতীকের বিষয় বিবেচনা করব।’ নাহিদ বলেন, ‘আমরা দেখেছি, আইসিটিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা এবং অভিযোগের কারণে সেনাবাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে আদালতে আনা হয়েছে। আমরা এটাকে সাধুবাদ জানিয়েছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘সারা দেশে শহীদ ও আহত পরিবারের পক্ষ থেকে যে মামলাগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সরকারের অবস্থান কী তা এখনো পরিষ্কার নয়। পত্রপত্রিকায় আমরা দেখছি, আসামিরা জামিনে মুক্তি পাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে শহীদ ও আহতদের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা শহীদ পরিবার ও আহতদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তার জন্য একটি রোডম্যাপ চেয়েছি। সেই রোডম্যাপ যেন প্রকাশ করা হয়। আট শর বেশি মামলা হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা কী, কিভাবে সেগুলো পরিচালিত হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে, এই বিষয়গুলো স্পষ্ট করা দরকার।’
এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ‘জনপ্রশাসনে যেসব বদলি হচ্ছে, তা কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? এসব পদায়ন ও বদলি কি আদৌ দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে, নাকি অন্য কোনো বিবেচনায়? আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ভাগবাটোয়ারা চলছে। নিজেদের বড় রাজনৈতিক দল দাবি করা কিছু সংগঠন এসপি, ডিসি—এমনকি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদেও প্রভাব রাখার চেষ্টা করছে।’ তিনি আরো বলেন, এই দলগুলো নির্বাচনের জন্য তালিকা তৈরি করে তা সরকারের কাছে জমা দিচ্ছে। এমনকি উপদেষ্টা পরিষদের ভেতর থেকেও তাদের সহায়তা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
নাহিদ ইসলাম প্রধান উপদেষ্টার প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, যেসব উপদেষ্টার বিরুদ্ধে এ ধরনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিষয়ে যেন প্রধান উপদেষ্টা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিন। তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছি—ছাত্র উপদেষ্টাদের যদি কোনো নির্দিষ্ট দলের সংশ্লিষ্ট হিসেবে দেখা হয়, তাহলে অন্যান্য দলের সুপারিশে যাঁরা উপদেষ্টা পরিষদে ঠাঁই পেয়েছেন তাঁদেরও একইভাবে দেখতে হবে। যে দুজন ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টা পরিষদে রয়েছেন তাঁরা কোনো দলের প্রতিনিধি হয়ে নয়, গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে রয়েছেন।’
প্রেস ব্রিফিংয়ে যা জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী : প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে বেরিয়ে দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘সংস্কারের বিষয়ে একমত জামায়াত সনদে সাক্ষর করেছে, যা ইতিহাসে লেখা থাকবে। প্রধান উপদেষ্টা এ কারণে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছেছি। সবাই স্বাক্ষর করেছি। এখন প্রয়োজন একে আইনি ভিত্তি দেওয়া। বাস্তবায়নও দরকার। নির্বাচন সম্পৃক্ত যেসব বিষয় আছে তা আগেই পাস করিয়ে তার ভিত্তিতে নির্বাচন দেওয়ার জন্য আমরা প্রধান উপদেষ্টার কাছে দাবি জানিয়েছি। প্রধান উপদেষ্টাও একমত হয়ে বলেছেন, এটি যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে পরিশ্রম পণ্ডশ্রম ছাড়া কিছুই না। সংস্কারের আইনি ভিত্তির জন্য এই আদেশ কে দেবেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা মনে করি, যদি আইনে কাভার করে, ব্যত্যয় না হয়, তাহলে আমরা চাই প্রধান উপদেষ্টা এই আদেশ দেবেন। রাষ্ট্রপতি যেন এই আদেশ না দেন।’
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘এখন একটি আদেশের মাধ্যমে এটির সাংবিধানিক মর্যাদা দিতে হবে। এটি একটি কনস্টিটিউশনাল অ্যারেঞ্জমেন্ট। সরকার এই পরিস্থিতি দেওয়ার এখতিয়ার রাখে। আদেশের মাধ্যমে বৈধতা দিতে হবে। সেই আদেশের ওপর গণভোট হবে। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের কথায় একমত হয়েছেন বলে মনে হয়েছে।’
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, জনগণের চাপে গণভোটে বিএনপিও রাজি হয়েছে। গণভোট ও নির্বাচন আলাদা জিনিস। বিএনপির দাবি অনুযায়ী, এই দুটি পৃথক বিষয় এক দিনে হতে পারে না। গণভোটের জন্য এখনো পর্যাপ্ত সময় আছে। নির্বাচনের দিন গণভোট হলে আইনগত জটিলতা তৈরি হবে জানিয়ে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট না হলে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশের কল্যাণের জন্য কিছু টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও গণভোট আগে করা ছাড়া উপায় নেই। নোট অব ডিসেন্ট নিয়েও আলোচনা রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে অযথা জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। ঐকমত্যের ভিত্তিতে আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন জরুরি, যাতে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে যেতে পারি। দলটির নায়েবে আমির বলেন, ‘আমরা প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছি, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করুন। রদবদল করা দরকার। প্রধান উপদেষ্টা আমাদের জানিয়েছেন, লটারির মাধ্যমে পোস্টিং ঠিক করবেন। আমরা এতে একমত হয়েছি।’ দলটির নায়েবে আমির বলেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। ফকিরহাটে শিবিরের ওপর হামলা হয়েছে। এভাবে হলে কিভাবে সুষ্ঠু ভোট হবে? সেটাও প্রধান উপদেষ্টাকে জানিয়েছি। তিনি আরো বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি হচ্ছে। আমরা রায়ের অপেক্ষায় আছি। তখন বিষয়টি আলোচনা করব। আইনে কোর্টের আদেশে কোনো ব্যত্যয় না থাকলে এই সরকারই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূমিকায় থাকবে।’
আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘কিছু উপদেষ্টার বিষয়ে বলেছি, কিছু লোক আপনাকে বিভ্রান্ত করে। কোনো দলের পক্ষে কাজ করে, তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। তবে অপসারণের কোনো দাবি করিনি। সুযোগ দিচ্ছি। না হলে যা করণীয় তা করব।’ এর আগে গত মঙ্গলবার বিএনপির তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছে। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ।
প্রধান উপদেষ্টা উভয় দলকে আশ্বস্ত করে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু করার স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকার সব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর করতে তিনি জামায়াত ও এনসিপিসহ সব ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা চান।
জামায়াত নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে আপনারা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে আমরা এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি; সামনে আরো অনেক উদ্যোগ আপনারা দেখতে পাবেন।’
সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে বলেও এনসিপিকে আশ্বস্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা।
এনসিপি ও জামায়াত নেতাদের প্রধান উপদেষ্টা জানান, নির্বাচনের আগে প্রশাসনের যেকোনো রদবদল তিনি নিজেই সরাসরি তদারকি করবেন।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে তিনি নেতাদের আশ্বস্ত করেন।