শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

পরীক্ষামূলক সংস্করণ

জাতীয়

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি

বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অর্থপাচারের গোপন সাম্রাজ্যের চিত্র ফাঁস হয়েছে বিশ্বজুড়ে চালানো একটি তদন্তে। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে নয়টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ৪৭০টিরও বেশি শেল কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা) পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এই অঙ্ক বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় […]

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি

নিউজ ডেস্ক

১৩ আগস্ট ২০২৫, ১১:৫০

বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক অর্থপাচারের গোপন সাম্রাজ্যের চিত্র ফাঁস হয়েছে বিশ্বজুড়ে চালানো একটি তদন্তে। চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে নয়টি দেশে ছড়িয়ে থাকা ৪৭০টিরও বেশি শেল কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা) পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এই অঙ্ক বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় চার শতাংশ, যা আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শুরু হওয়া অনুসন্ধানে উঠে এসেছে বিলাসবহুল ভিলা, পাঁচতারকা হোটেল, অফশোর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং গোপন নাগরিকত্ব কেনার মতো বিস্ময়কর সম্পদের বিস্তার। দীর্ঘদিন গোপন থাকার এখন যা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বেপরোয়া আর্থিক কেলেঙ্কারি হয়ে উঠছে।

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি 1

৪৭০ শেল কোম্পানির আড়ালে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার

অন্তত নয়টি বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—এস আলম গ্রুপ অন্তত ৪৭০টি ‘শেল কোম্পানি’র মাধ্যমে নয়টি দেশে পাচার করেছে প্রায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা (২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। বাংলাদেশের বর্তমান জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশের সমান টাকা একক কোনো করপোরেট চক্রের হাত ধরে দেশের বাইরে পাচার, এমন কেলেঙ্কারি দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি 2

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থপাচারের এই ধরন ছিল জটিল ও বহুমুখী। দীর্ঘ পরিকল্পনা করে প্রতিটি দেশে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক শেল কোম্পানি। কাগজে-কলমে এগুলো আলাদা প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে একই নেটওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। আর্থিক উৎস গোপন রাখতে এসব কোম্পানি নিবন্ধনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো মূলধন উল্লেখ করা হয়নি।

নতুন ৮ দেশে এস আলমের টাকাপাচারের চিহ্ন, ১১৭ দেশে এই প্রথম নজিরবিহীন তল্লাশি 3

১১৭ দেশে একযোগে অনুসন্ধান এই প্রথম

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধান কার্যক্রম সাধারণত কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকং, থাইল্যান্ড ও সুইজারল্যান্ড। কিন্তু এস আলমের বেলায় এসে তদন্তের এই সীমা ভেঙে গেছে।

এস আলমভিত্তিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণকারী বিশেষ পর্যালোচনা কমিটির সদস্য মোশাররফ হোসেনের নির্দেশনায় তদন্তকারীরা নজিরবিহীনভাবে ১১৭টি দেশে সম্পদের খোঁজে অনুসন্ধান চালায়। এই অনুসন্ধান ছিল শুধু অনুমানের ওপর নির্ভরশীল ছিল না। বরং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের সক্রিয় সহযোগিতায় সেখানে এস আলমের প্রকৃত বিনিয়োগ, সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের সন্ধান পাওয়া গেছে।

ফলাফলও ছিল চমকপ্রদ। সাইপ্রাস, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, ইতালি, তুরস্ক, সিঙ্গাপুর, জার্সি, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং আইল অব ম্যানসহ বহু অঞ্চলে এস আলম সংশ্লিষ্টদের উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের খোঁজ মিলেছে। এর মধ্যে সাতটি দেশ তদন্ত দলের কাছে প্রমাণসাপেক্ষ তথ্য সরবরাহ করেছে। বাকি দেশগুলো শুধুমাত্র নোট পাঠিয়েছে।

এই সাত দেশের সুনির্দিষ্ট নথির ভিত্তিতে তদন্তকারীরা জটিল আন্তঃসীমান্ত আইনি প্রক্রিয়া অতিক্রম করে আদালতের আদেশ পান, যার মাধ্যমে সিঙ্গাপুর, জার্সি, সাইপ্রাস ও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ব্যাংক হিসাব ও বিনিয়োগ সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের অনুমতি মিলেছে।

ট্যাক্স হেভেনে হাজার কোটির শেল কোম্পানি

আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের তদন্ত দল করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জে সাইফুল আলম মাসুদ বা তার পরিবারের নামে নিবন্ধিত ১৯টি কোম্পানি চিহ্নিত করেছে। কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে নিবন্ধিত। আওয়ামী লীগ আমলে ঠিক ওই সময়ে ব্যাংক খাতে এস আলম গ্রুপের বেপরোয়া হস্তক্ষেপ নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়েছিল।

মাসুদ ও ফারজানা পারভীনের মালিকানাধীন একাধিক শেল কোম্পানির মধ্যে রয়েছে ৩৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) মূলধন দেখানো হ্যাজেল ইন্টারন্যাশনাল এবং পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংস।

একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হলো গ্রিনউইচ ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড, যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর ২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট নিবন্ধিত হয়। অন্যদিকে প্রায় সবগুলো কোম্পানি নিবন্ধনের সময় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো মূলধন উল্লেখ করা না হলেও হ্যাজেল ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেডের বেলায় এর ব্যতিক্রম ঘটেছে। ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ সাইফুল আলম মাসুদের নামে নিবন্ধিত ওই কোম্পানির ঘোষিত মূলধন দেখানো হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলার (প্রায় ৪ কোটি টাকা)।

ট্যাক্স হ্যাভেন বা করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত স্বশাসিত ব্রিটিশ অঞ্চল জার্সিতে সাইফুল আলম মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীনকে স্থানীয় একটি ট্রাস্ট কোম্পানির মাধ্যমে ছয়টি জার্সি ট্রাস্টের যৌথ প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পাওয়া গেছে। এই জার্সি ট্রাস্টগুলো হচ্ছে— ম্যাপল, ক্যাপ্রি, সারে, শেন্টন, মারিনা, মিশন। এসবের মাধ্যমে তারা মালিক হয়েছেন অন্তত দুটি পাঁচ তারকা হোটেলের। ম্যাপল ট্রাস্ট রেনেসাঁ হোটেল ও ফোর পয়েন্টস শেরাটন (মালয়েশিয়া) নামের এই দুটি হোটেলের বাজারমূল্য প্রায় ২১ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ২ হাজার ২০৩ কোটি টাকা)।

মেজ ছেলে সাত মিলিয়নের ভিলা মালিক

করের স্বর্গ হিসেবে পরিচিত আরেক অঞ্চল ‘আইল অফ ম্যান’-এ চেয়ারম্যানের সাইফুল আলম মাসুদের মেজ ছেলে ২৫ বছর বয়সী আশরাফুল আলমের মালিকানায় রয়েছে ৭ মিলিয়ন ডলারের (প্রায় ৭৫ কোটি টাকা) একটি ভিলা, যার ঠিকানা ব্রিটেনের কর্টন এলাকার লেদারহেড অক্সশটের ব্রুকউডের ১৫ নম্বর প্রিন্সেস ড্রাইভ। ২০২০ সালে কেনা এই সম্পত্তি আশরাফুলের মা ফারজানা পারভীনের উপহার হিসেবে নিবন্ধিত। এটি আগে সিঙ্গাপুরে বন্ধক ছিল।

তুরস্কে দুই ভাইয়ের ১০ প্রিমিয়াম অ্যাকাউন্ট

তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত্ব জিরাত ব্যাংক ও দ্বিতীয় বৃহত্তম ভাকিফলার ব্যাংকে সাইফুল আলম মাসুদের দুই ভাই শহীদুল আলম ও ওসমান গনিসহ সহযোগীদের নামে অন্তত ১০টি ‘প্রিমিয়াম’ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত হয়েছে। এসব ‘প্রিমিয়াম’ অ্যাকাউন্ট সাধারণত বড় অঙ্কের আমানতের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে এসব একাউন্টে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো লেনদেন সংযুক্ত নয়।

দুবাইয়ের বিলাসী ভিলায় লাখ লাখ ডলার

সংযুক্ত আরব আমিরাতে মাসুদের বড় মেয়ে মায়মুনা খানমের স্বামী বেলাল আহমেদের নামে নিবন্ধিত অন্তত ছয়টি বিলাসবহুল ভিলার খোঁজ মিলেছে, যার দাম ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ১৮ লাখ মার্কিন ডলারের (প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা) মধ্যে। এছাড়া চট্টগ্রামভিত্তিক ইউনিটেক্স গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার বেলালের নামে দুটি প্লটও আছে আমিরাতে, যার মোট মূল্য প্রায় ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৫৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা)। দুবাইয়ে ফ্যান্টম ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বেলাল আহমেদ এবং স্প্রিংহিল ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং নামের অপর একটি কোম্পানির নামে তার শাশুড়ি ফারজানা পারভীন একাধিক বিলাসবহুল ভিলা ও জমি কিনেছেন।

সাইপ্রাসে কোটি ডলারের সম্পত্তির রহস্য

সাইপ্রাসের অভিজাত লিমাসল (পারেকলিসিয়া) এলাকায় একটি দোতলা ভবন রয়েছে এস আলমের, যার মূল্য অজানা। ভূমধ্যসাগরের তৃতীয় বৃহত্তম দ্বীপদেশটিতে সাইফুল আলম মাসুদ ও তার মালিকানাধীন এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে অন্তত তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা বর্তমানে বন্ধ। ২০১৬ সালে এক্লেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানটি কেনার পর নাম বদলে এক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড রাখা হয়।

এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ সপরিবারে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব নেন ২০০৯ সালে। এর বিনিময়ে তাকে দেশটির আবাসনখাতে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) বিনিয়োগ করতে হয়। এছাড়া সরকারি গবেষণা ও ভূমি উন্নয়ন তহবিলে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা) অনুদান হিসেবে দিতে হয়।

সিঙ্গাপুরে ২১ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিলিয়নের মালিকানা

সিঙ্গাপুরে সাইফুল আলম মাসুদ, ফারজানা পারভীন ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নামে ২১টিরও বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ১৭টির বেশি বীমা পলিসি ও ব্রোকারেজ বিনিয়োগ রয়েছে।

২০০৯ সালের ২৭ আগস্ট সাইফুল আলম মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন নিজেদের ‘সাইপ্রাসের নাগরিক’ উল্লেখ করে সিঙ্গাপুরে ক্যানালি লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নেন। প্রতিষ্ঠানটির মূলধন দেখানো হয় ২২ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ২৫ কোটি টাকা)।

২০১৬ সালের ১২ জুলাই ক্যানালি লজিস্টিক্সের নাম বদলে রাখা হয় ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনাল— যার রেজিস্ট্রেশন নাম্বার ২০১৫০১০২৮৪৯২ (১১৫৩৮১৬-এক্স) ঠিকানা কুয়ালালামপুরের ৬৩ জালান আমপাং উইজমা প্যারাডাইসের লেভেল ৬-এর স্যুট ৬.০১। অন্যদিকে ব্যবসায়িক ঠিকানা কুয়ালালামপুরের L11-1, জালান সুলতান আবদুল সামাদ ব্রিকফিল্ডসের মেনারা সেন্ট্রাল ভিস্তার ১১তম ফ্লোর। কোম্পানিটির মোট ৫০ লাখ শেয়ারের ৩৫ লাখই মাসুদের নামে আর স্ত্রী ফারজানা পারভীনের নামে ১৫ লাখ শেয়ার।

অন্যদিকে ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর মাসুদেরই মালিকানাধীন ক্যানালি শিপিংয়ের নাম বদলে রাখা হয় উইলকিনসন ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিমিটেড, যার সম্পদের মূল্য পরবর্তী কয়েক বছরে এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি (প্রায় ১ হাজার ৫৫ হাজার কোটি টাকা) দাঁড়ায়। মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর উইলকিনসনে নিজেদের পুরো মালিকানা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংস ও নিউহ্যাভেন কর্পোরেট সার্ভিস নামের দুটি কোম্পানিতে হস্তান্তর করেন। পিকক প্রোপার্টি হোল্ডিংস উইলকিনসনের ৩ কোটি সিঙ্গাপুরিয়ান ডলারের সমমূল্যের শেয়ারের পুরোটার মালিক। পিককের পেছনে আছে জার্সিভিত্তিক আরেক শেল কোম্পানি সানতেরা। তবে অং লে কিম নামে সিঙ্গাপুরের এক নাগরিককে উইলকিনসনের পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত করেন। সিঙ্গাপুরে এই কোম্পানির ঠিকানা ইউওবি প্লাজার ৮০ রেফলস প্লেইস। পাঁচ বছর আগে ২০২০ সালে কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৪০ কোটি টাকা।

২০১৬ সালে এস আলম গ্রুপ ভেঞ্চুরা ইন্টারন্যাশনালের নামে কুয়ালালামপুরের পাঁচতারা হোটেল রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর কিনে নেয়। হোটেলটি গত ২০ বছর ধরে পরিচালনা করে আসছিল ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনাল, তারাই পরবর্তী ১০ বছরের জন্য হোটেলের দায়িত্ব নেয় আবার। এজন্য এস আলম গ্রুপ ব্যয় করে বাংলাদেশি টাকায় ১ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা।

২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট এস আলমের ক্যানালি লজিস্টিকস সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়ায় ১৭৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে (প্রায় ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা) গ্র্যান্ড চ্যান্সেলর প্রাইভেট লিমিটেড হোটেল কিনে নেয়। এর এক বছর পর হোটেলটির নাম বদলে প্রথমে ‘গ্র্যান্ড ইম্পেরিয়াল’ এবং পরে ‘হিলটন গার্ডেন ইন সেরাঙ্গুন’ করা হয়। এর দুই বছর পর সিঙ্গাপুরের লিটল ইন্ডিয়ার সেরাঙ্গুন প্লাজায় অবস্থিত সেন্ট্রিয়াম স্কয়ারে ১৫৩ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) ২৭ হাজার বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস কিনে নেয় এস আলমের ক্যানালি।

মাসুদ ও তার পরিবার পরে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্বও নেন। তবে দেশ দুটিতে দ্বৈত নাগরিকত্বের অনুমোদন না থাকায় তারা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন। ২০২২ সালের ১০ অক্টোবর সকালে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রত্যাহার করেন মাসুদ ও তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন এবং তাদের তিন ছেলে আহসানুল আলম, আশরাফুল আলম ও আসাদুল আলম মাহির। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সেদিনই সন্ধ্যায় বিদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের (পারমানেন্ট রেসিডেন্সিয়াল) অনুমোদনও পায় পরিবারটি। বিদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে স্থায়ী বসবাসের (পারমানেন্ট রেসিডেন্সি) সুযোগ পেতে এস আলম পরিবারের সদস্যরা জনপ্রতি বিনিয়োগ দেখান ৭৫ হাজার ডলার (প্রায় ৯০ লাখ টাকা) করে।

লেনদেন চলছেই ইটালির দুই একাউন্টে

ইটালিয়ান আর্থিক প্রতিষ্ঠান পোস্তে ইতালিয়ানে এসপিএ-তে সাইফুল আলম মাসুদ ও তার জামাতা বেলাল আহমেদের নামে দুটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যাতে লেনদেন এখনও সক্রিয়। এছাড়া আরেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এক্সট্রাবাঙ্কা এসপিএতে মাসুদের একটি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা বর্তমানে বন্ধ।

জামাতার অ্যান্টিগুয়া নাগরিকত্বের টাকা আসে কানাডা থেকে

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, সাইফুল আলমের জামাতা বেলাল আহমেদ অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার নাগরিকত্ব কিনেছেন দেশটির ‘সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’-এর মাধ্যমে, যেখানে জাতীয় উন্নয়ন তহবিলে ১ লাখ মার্কিন ডলার (প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা) দিতে হয়।

লেনদেনের নথি বলছে, ওই অর্থ এসেছিল কানাডার অন্টারিও প্রদেশের মিসিসাগায় অবস্থিত টরন্টো-ডমিনিয়ন ব্যাংকে বেলাল আহমেদের অ্যাকাউন্ট থেকে পাঠানো ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৫ ডলারের (প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা) অনলাইন ট্রান্সফারের মাধ্যমে। আবেদনপত্র প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধানের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান জেমস অ্যান্ড ম্যাগিনলি লিমিটেড ওই অর্থ গ্রহণ করে নাগরিকত্ব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে।

গায়ের জোরে ব্যাংক দখলে এস আলম

চট্টগ্রামভিত্তিক বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান এস আলমের উত্থানের পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল দেশের ব্যাংক খাতে আগ্রাসী দখল ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দেশের স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণে আনার পদক্ষেপ ধীরে ধীরে চলতে থাকে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি চূড়ান্তভাবে এস আলমের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশনায় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সরাসরি সহযোগিতায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাড়ি থেকে তুলে ঢাকার সেনানিবাসে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয় এবং একই দিন নতুন কর্মকর্তাদের বসানো হয়।

একই কৌশলে ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডও (এসআইবিএল) দখল করা হয়। দখলের আগে ১৯টি প্রক্সি কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের প্রায় ৫০ শতাংশ শেয়ার কিনে নেয় এস আলম, যা ছিল সরাসরি ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনের লঙ্ঘন।

দুর্নীতির মামলা ও বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, সাইফুল আলম ও তার সহযোগীরা আত্মীয়দের নামে ভুয়া ঋণ ও বিনিয়োগ তৈরি করে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। আদালত ইতোমধ্যে তাদের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার নির্দেশ দিয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দুদক সাইফুল আলম ও তার স্ত্রী ফারজানার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকার (প্রায় ১ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা) অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা করেছে। এছাড়া তাদের দুই ছেলে আহসানুল আলম মারুফ ও আশরাফুল আলমের বিরুদ্ধে ইসলামী ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা (প্রায় ২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা) আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

জাতীয়

সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না : এডিসি জুয়েল

নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এডিসি জুয়েল। তিনি বলেছেন, নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তার বক্তব্য—“সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না।” সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে এসব […]

নিউজ ডেস্ক

১০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১৮:৫৯

নির্বাচনী নিরাপত্তা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এডিসি জুয়েল। তিনি বলেছেন, নির্বাচন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং ব্যালট বাক্সে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে কঠিন পরিণতি ভোগ করতে হবে। তার বক্তব্য—“সবার হাতে এ কে-৪৭ থাকবে, ব্যালট বাক্সে হাত দিলে হাতই থাকবে না।”

সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) এক নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন এডিসি জুয়েল। তিনি বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। কোনো ধরনের সন্ত্রাস, ভোট কারচুপি কিংবা কেন্দ্র দখলের চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না।

এডিসি জুয়েল আরও বলেন, নির্বাচনের দিন প্রতিটি কেন্দ্র থাকবে কড়া নজরদারিতে। পুলিশ, বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে। যারা ভোটের পরিবেশ নষ্ট করতে চাইবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ এটিকে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ ভাষা ব্যবহারের সমালোচনাও করছেন।

তবে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচন নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে আস্থা তৈরি করা এবং দুষ্কৃতকারীদের সতর্ক করা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নির্বাচনকে ঘিরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা হতে দেবে না বলেও তারা পুনর্ব্যক্ত করেছে।

জাতীয়

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সাড়ে নয় হাজারের বেশি সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাঁদের নিয়োগ যাচাই-বাছাই করে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে ইতিমধ্যে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেড় হাজারজন উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং কনস্টেবল পদে আট হাজারের বেশি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁরা গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর […]

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

আওয়ামী লীগ আমলের নিয়োগ: তদন্তের মুখে পুলিশ বাহিনীর সাড়ে ৯ হাজার নিয়োগ

নিউজ ডেস্ক

২৭ মার্চ ২০২৬, ০৯:৪৭

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া সাড়ে নয় হাজারের বেশি সদস্যের নিয়োগপ্রক্রিয়া খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তাঁদের নিয়োগ যাচাই-বাছাই করে তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে ইতিমধ্যে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

এই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দেড় হাজারজন উপপরিদর্শক (এসআই) পদে এবং কনস্টেবল পদে আট হাজারের বেশি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাঁরা গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরের বাসিন্দা। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের অনেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী অথবা দলীয় রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্য।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা কোটা লঙ্ঘন এবং স্থায়ী ঠিকানার তথ্য গোপন করে রাজনৈতিক প্রভাবে অনিয়মের মাধ্যমে এসব উপপরিদর্শক ও কনস্টেবলকে নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তর এসব নিয়োগ যাচাই-বাছাই করবে। অসংগতি পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত সরকারের (আওয়ামী লীগ সরকার) আমলে পুলিশের নিয়োগে বিভিন্ন পর্যায়ে জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। অনেকে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করে ও অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন। বিষয়গুলো তদন্তের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি তদন্তে যেন কারও প্রতি অন্যায় বা জুলুম করা না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনিয়ম করার সাহস কেউ না পায়, সে লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর দ্বিতীয় বৈঠকেই পুলিশের এসব নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছেন। এই তদন্ত করবে মূলত পুলিশ সদর দপ্তর এবং এ বিষয়ে যেকোনো সহায়তা দেবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ঠিকানা পরিবর্তন, কোটা জালিয়াতি এবং ‘ছাত্রলীগ কোটা’ থেকে সরাসরি নিয়োগ পাওয়া এক হাজার ২১৭ জনসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে অন্তত দেড় হাজার উপপরিদর্শক ও আট হাজারের বেশি কনস্টেবলের নিয়োগপ্রক্রিয়া পুনরায় যাচাই-বাছাই করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সূত্র বলেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে সারা দেশে পুলিশ বাহিনীতে প্রায় ৪৫ হাজার সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে উপপরিদর্শক অন্তত ১০ হাজার ও কনস্টেবল পর্যায়ে ৩৫ হাজার।

বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় লোকজনকে পুলিশ বাহিনীতে নিয়োগ দিয়েছে। পুলিশকে দলীয়করণের মাধ্যমে রাজনৈতিক কাজে অর্থাৎ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ধরপাকড়, গুম, হত্যা, নির্যাতন ও দমন-পীড়নে ব্যবহার করেছে।

পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কনস্টেবল নিয়োগের ক্ষেত্রে জেলাভিত্তিক কোটা থাকলেও তা লঙ্ঘন করে গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর, কিশোরগঞ্জ ও মাদারীপুরের বিপুলসংখ্যক লোক নিয়োগ করা হয়। এসব অঞ্চলে কোটার ৩ গুণেরও বেশি লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চল থেকে ১০ হাজার এবং কিশোরগঞ্জ থেকে ৭ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়। শুধু গোপালগঞ্জ জেলা থেকেই নিয়োগ পান ৮ হাজার জন। মাদারীপুর ও শরীয়তপুর জেলা থেকেও বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর বাইরে ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দা সাজিয়ে এক হাজার লোককে কনস্টেবল পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই নিয়োগ হয় ২০১১ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে। ভুয়া জমির দলিল ও জাল নাগরিক সনদের ভিত্তিতে অন্য জেলার লোকদের ধামরাই উপজেলার বাসিন্দা দেখিয়ে কনস্টেবল পদে নিয়োগের ব্যবস্থা করে পুলিশের ভেতরের আওয়ামী লীগপন্থী একটি চক্র।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কনস্টেবলদের মতো উপপরিদর্শক পদে আট ব্যাচের নিয়োগেও জেলা কোটা মানা হয়নি। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও মাদারীপুরের প্রার্থীদের বেশি নিয়োগ দেওয়া হয়। অন্য জেলার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং দলীয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত পরিবারের সদস্যদের।

উপপরিদর্শক নিয়োগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত আটটি (৩৩তম থেকে ৪০তম) ব্যাচে অন্তত ১০ হাজার উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা বাতিলের পরিপত্র জারির আগপর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা, জেলা, নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী—এই পাঁচ ক্যাটাগরিতে মোট ৫৬ শতাংশ কোটা ছিল।

৩৬তম থেকে ৪০তম ব্যাচের নিয়োগ পর্যালোচনায় দেখা যায়, জেলা কোটা অনুযায়ী গোপালগঞ্জের শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ প্রার্থী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ পায় ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ, যা সংখ্যায় ২৩২ জন। ফরিদপুরের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশের সুযোগ থাকলেও নিয়োগ দেওয়া হয় ১৮৭ জনকে। শূন্য দশমিক ৮১ শতাংশ কোটার সুযোগ থাকা মাদারীপুর থেকে নিয়োগ পান ১৩৩ জন। এভাবে কোটা লঙ্ঘন করে ৫৫২ জন উপপরিদর্শক নিয়োগ করা হয়। এই ব্যাচগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ৬৬৫ জন রয়েছেন। জনশ্রুতি রয়েছে, তাঁরা সরাসরি ছাত্রলীগ-সম্পৃক্ত কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এই উপপরিদর্শকদের নিয়োগ দিয়ে মাঠে নামাতে নানা অনিয়ম করা হয়। দুই বছরের প্রশিক্ষণ কমিয়ে এক বছর করা হয়। লিখিত পরীক্ষা শেষে মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নেওয়ার আগেই পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন করা হয়।

সার্বিক বিষয়ে সদ্য বিদায়ী পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) বাহারুল আলম বলেন, সচিবালয়ে এক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিগত সময়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সদস্যদের নিয়োগপ্রক্রিয়া যাচাই-বাছাই করে দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো ধরনের অসংগতি পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে মন্ত্রীর বার্তা পুলিশ সদর দপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটি গঠন করে নিয়োগ যাচাই-বাছাই করবে পুলিশ সদর দপ্তর।

পুলিশ সদর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৫ মার্চ এক অফিস আদেশে জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবলদের (টিআরসি) শনাক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়টিও এতে জানানো হয়েছে। অতিরিক্ত ডিআইজি (রিক্রুটমেন্ট অ্যান্ড ক্যারিয়ার প্ল্যানিং-১) মো. আবু হাসানের সই করা ওই অফিস আদেশ দেশের সব জেলার পুলিশ সুপারদের পাঠানো হয়েছে।

জাতীয়

যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন অর্ন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন

যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন অর্ন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম অনুকুশীলব, কুচক্রীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিএনপি ভাঙার অপচেষ্টা ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সদ্য বিদায়ি অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে তাঁর পুত্র এম […]

নিউজ ডেস্ক

০৬ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৫৩

যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন অর্ন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। ওয়ান-ইলেভেনের অন্যতম অনুকুশীলব, কুচক্রীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিএনপি ভাঙার অপচেষ্টা ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া সদ্য বিদায়ি অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে তাঁর পুত্র এম সাফাক হোসেনের একচ্ছত্র প্রভাবে বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টির বিষয়গুলো নিয়েও তদন্ত হবে বলে জানা গেছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন নির্বাচন কমিশনের প্রভাবশালী কমিশনার। সম্প্রতি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মূলত মইন, মাসুদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তার দায়িত্ব ছিল কমিশনের পক্ষে কুচক্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা।

তারা যেভাবে নির্দেশনা দিতেন তা বাস্তবায়ন করা। সে সময় বিএনপিকে ভাঙার অপচেষ্টার নেতৃত্বও তিনিই দিয়েছিলেন। সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো ২০০৮-এর নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করতে যে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো হয়, সেগুলো তার তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। ব্যালটের ডিজাইনসহ অন্যান্য প্রিন্টিং তথ্য-উপাত্ত লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে তিনি সরবরাহ করেছিলেন।

শেখ মামুন তখন ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ছিলেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা ও অপর কমিশনার ছিলেন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন। সচিব ছিলেন হুমায়ূন কবির। মইন, মাসুদদের প্রভাবে এই তিনজনকে সব সময় চাপে রাখতেন সাখাওয়াত। সে কারণে সাখাওয়াতের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কিছুই করার ছিল না।

এ সময় ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকল্পের পিডি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। যুগ্ম সচিব ছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা কমিশনে এই দুইজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়। সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান-ইলেভেনের সময় মইন, মাসুদ ও শেখ মামুনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে যেসব অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমানে তিনি গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিগত অর্ন্তবর্তী সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে অর্ন্তবর্তী সরকারে তাকে উপদেষ্টা করা হয়। কিন্তু একপর্যায়ে নানান কর্মকাণ্ড ও কথাবার্তায় সরকার বিব্রত হলে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পদত্যাগের হুমকি দেন।

কিন্তু সরকারের বিভিন্ন স্পর্শকাতর দপ্তরে তার কর্মকাণ্ডের কিছু তথ্যপ্রমাণ থাকার কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার কিচেন কেবিনেটের সদস্যরা তাকে আর আস্থায় নিতে পারেননি। সে কারণে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো আলোচনায়ও তাকে রাখা হয়নি। অবশ্য কিচেন কেবিনেট ও নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাকে না রাখার ব্যাপারে তিনি নিজেই সম্প্রতি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছেন।

সেই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর অন্য উপদেষ্টারা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করে একজন সাবেক উপদেষ্টা বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন যা করেছেন, সেগুলো থেকে বাঁচার জন্য তিনি অর্ন্তবর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো বক্তব্য দিয়ে বিএনপির কাছে ভালো থাকার অপচেষ্টা করেছেন।’

এদিকে অর্ন্তবর্তী সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর তার পুত্র এম সাফাক হোসেন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডেও সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল সাফাক হোসেনের। তার নেপথ্য নেতৃত্বেই চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হয়।

এ কাজ করার জন্য অনেক বড় লেনদেন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বে-টার্মিনালের পরিবহন টার্মিনাল প্রকল্পের মাটি ভরাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অন্যান্য কাজের সব নিয়ন্ত্রণ করেন সাফাক হোসেন। তালতলা ইয়ার্ড নির্মাণের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন সাফাক হোসেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর গেটে ক্যামিক্যাল শেড নির্মাণকাজেও হস্তক্ষেপ করেন সাফাক। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটা সিভিল কাজের জন্য ৫ শতাংশ, ডিপিএমের (সরাসরি টেন্ডার পদ্ধতি) জন্য ১০ শতাংশ কমিশন নিতেন সাফাক। যন্ত্রাংশ ক্রয়ে অনিয়মে জড়িত ছিলেন উপদেষ্টাপুত্র। তিনি কাজের ধরনভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন। সাখাওয়াতপুত্রের নানান দুর্নীতির খবর এখন চট্টগ্রাম বন্দরে সবার মুখে মুখে। এসব অভিযোগও তদন্ত করা হবে বলে জানা গেছে।