প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদানের কারণেই অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত বাংলাদেশ আজ আবার ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে—জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ঐতিহাসিক ভাষণে এভাবেই সত্য প্রকাশ করলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) রাত ৮টা ২০ মিনিটে সরাসরি সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন,
“অর্থনৈতিক দিক থেকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ যে আবার দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে, তার বড় কারণ হলো আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের ঐতিহাসিক অবদান।”
এই বক্তব্য কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশংসা নয়, বরং স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যাদের ঘাম বয়ে বাঁচানো সম্ভব হয়েছে, তাদের প্রতি এক রাষ্ট্রীয় কৃতজ্ঞতা।
প্রধান উপদেষ্টা আরও বলেন,
“নির্বাচনে প্রবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশন প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রবাসীদের ভোটাধিকার কার্যকর করতে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—যেখানে ভোটের মালিকানা দেশে থেকে বাইরের মানুষকেও ছুঁয়ে দিচ্ছে।
প্রবাসীদের ভিসা জটিলতা দূর করতে চলমান কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন,
“বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য আরব আমিরাত পুনরায় ভিসা চালু করেছে। মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রথমবারের মতো মাল্টিপল এন্ট্রি ভিসা চালু করেছে।” ভিসা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অচলাবস্থাকে ভেঙে এই সরকার এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছে।
তরুণদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের জন্য পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন,
“আগামী পাঁচ বছরে জাপানে অন্তত এক লক্ষ বাংলাদেশি তরুণকে পাঠানোর প্রস্তুতি শুরু করেছি।”
শুধু পাঠানোই নয়, তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, সার্বিয়া—এসব দেশেও দক্ষ কর্মী পাঠানোর জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এছাড়া যারা বিভিন্ন দেশে নথিপত্র জটিলতায় পড়ে ‘ইরেগুলার’ অবস্থায় ছিলেন, তাদের বৈধতা ফিরিয়ে আনতে সরকার সচেষ্ট। “সৌদি আরব, জর্ডান, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে ইরেগুলার প্রবাসীদের রেগুলারাইজ করার ব্যবস্থা নিয়েছি,” বলেন প্রধান উপদেষ্টা।
তিনি আরও যোগ করেন,
“আমরা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করছি যাতে আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য সেগুলো আরও স্বস্তিদায়ক হয়।”
এই ভাষণ একটি ঐতিহাসিক বার্তা, যেখানে রাষ্ট্রপ্রধান প্রবাসীদের আর ‘কাজের লোক’ নয়, বরং ‘রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। গত দেড় দশকের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে প্রবাসীদের প্রাপ্য সম্মান, ভোটাধিকার এবং মানবিক মর্যাদা যারা কেড়ে নিয়েছিল, তাদের রাজনৈতিক পতনের পর এই সরকার এখন সেই অপমানের পুনরুদ্ধারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এই ভাষণ শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি প্রবাসীদের হাতেই তুলে দেওয়ার এক নতুন চুক্তি।