ইসলামি ইতিহাসের এক অত্যন্ত মহৎ ঘটনা হলো হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মিরাজের ঘটনা। মিরাজে নবীজি সপ্ত আসমান ভ্রমণ করেছিলেন এবং সেখানে প্রত্যেক আসমানে নবীজির সাক্ষাৎ হয়েছিল পূর্ববর্তী নবীদের সাথে, যারা প্রত্যেকেই তাঁকে স্বাগত জানিয়ে আল্লাহর কাছ থেকে প্রাপ্ত দুয়া করেছিলেন। নবীজির এই সফর শুধুমাত্র তাঁর জন্য নয়, বরং সমগ্র মুসলিম উম্মতের জন্য একটি শিক্ষা ও উন্নতির পথ প্রদর্শন করে।
প্রথম আসমান
প্রথমে দুনিয়ার দৃশ্যমান আসমানে গিয়ে হজরত জিবরীল আ. তার দ্বার উন্মুক্ত করার অনুরোধ করলেন। জিজ্ঞেস করা হল, কে আপনি? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞাসা করা হল, তার কাছে কি আপনাকে পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর নবীজিকে সম্ভাষণ জানানো হল, মারহাবা, উত্তম আগমনকারীর আগমন ঘটেছে! খুলে দেওয়া হল নবীজির জন্য প্রথম আসমানের দরজা।
নবীজি সা. প্রথম আসমানে গেলেন। সেখানে ছিলেন আমাদের আদী পিতা হজরত আদম আ.। জিবরীল তাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। নবীজী হজরত আদম আ.-কে সালাম বললেন। বাবা আদম জবাব দিলেন। নবীজীকে সাদর অভিবাদন জানালেন, মারহাবা, নেককার পুত্র ও নেককার নবী। হজরত আদম আ. নবীজীর জন্য দুআ করলেন।
এই আসমানে নবী কারিম সা.-কে হাওজে কাওছারও দেখানো হয়, যার পানি মেশকের থেকেও অধিক সুগন্ধময়। (সহিহ বুখারি, হাদীস ৭৫১৭)
দ্বিতীয় আসমান
এরপর নবীজি উঠতে থাকলেন দ্বিতীয় আসমানের দিকে। সেখানেও দরজা খুলতে প্রথম আসমানের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। এরপর নবীজিকে স্বাগত জানানো হল। নবীজি সা. সেখানে দেখতে পেলেন দুই খালাত ভাই হজরত ঈসা আ. ও হজরত ইয়াহইয়া ইবনে যাকারিয়া আ.-কে। তাদের সাথে নবীজির সালাম বিনিময় হল। তারা নবীজিকে স্বাগত জানালেন, মারহাবা, আমাদের পুণ্যবান ভাই এবং নবী। তারা নবীজির জন্য দুয়া করলেন।
তৃতীয় আসমান
এরপর নবীজীকে তৃতীয় আসমানের দিকে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানেও দুই আসমানের মতো জিজ্ঞাসাবাদ হল এবং নবীজীকে স্বাগত জানানো হল। সেখানে গিয়ে নবীজি দেখলেন হজরত ইউসুফ আ.। হজরত ইউসুফের সাথে নবীজীর সালাম ও কুশল বিনিময় হল। নবী কারীম সা. বলেন, হজরত ইউসুফ আ.-কে যেন দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য ঢেলে দেওয়া হয়েছে!
চতুর্থ আসমান
এরপর চললেন চতুর্থ আসমানের দিকে। সেখানেও পূর্বের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করা হল। স্বাগত-সম্মান জানানো হল। সেখানে হজরত ইদরীস আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হল। সালাম ও কুশল বিনিময় হল। হজরত ইদরীস আ. নবীজির জন্য দুয়া করলেন।
পঞ্চম আসমান
এরপর চললেন পঞ্চম আসমানের দিকে। সেখানে হজরত হারূন আ.-এর সাথে সাক্ষাৎ হল।
ষষ্ঠ আসমান
এরপর চললেন ষষ্ঠ আসমানের দিকে। সেখানেও পূর্বের পর্বগুলোর মতো জিজ্ঞাসা করা হল। নবী সা.-কে অভিনন্দন জানানো হল। সেখানে দেখা হল হজরত মূসা আ.-এর সাথে। হজরত মূসা আ. নবীজিকে খুব ইস্তেকবাল করলেন।
সপ্তম আসমান
এরপর নবী কারীম সা. সপ্তম আসমানের দিকে উঠতে থাকেন। সেখানে দেখা হল হজরত ইবরাহিম আ.-এর সাথে। জিবরীল আ. পরিচয় করিয়ে দিলেন, এনি আপনার পিতা, সালাম করুন। নবী কারিম সা. হজরত ইবরাহিম আ.-এর সাথে সালাম বিনিময় করলেন।
নবী সা. বলেন, হজরত ইবরাহিম আ. তখন বাইতুল মামুরে হেলান দিয়েছিলেন। বাইতুল মামুর, যেখানে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা আসেন। এরপর এই সত্তর হাজার আর ফিরে আসেন না। এভাবে প্রতিদিন সত্তর হাজার করে ফেরেশতাদের নতুন নতুন কাফেলা আসতে থাকে।
হজরত ইবরাহীম আ.-এর সাথে মুলাকাত হলে তিনি নবীজিকে বলেন, আপনি আপনার উম্মতের কাছে আমার সালাম পৌঁছাবেন। আর তাদেরকে বলবেন, জান্নাতের মাটি পবিত্র ও সুঘ্রাণযুক্ত, এর পানি সুমিষ্ট এবং এর ভূমি উর্বর ও সমতল। আর এর বৃক্ষ হচ্ছে,
سُبْحَانَ اللَّهِ وَالحَمْدُ لِلَّهِ وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاللَّهُ أَكْبَرُ
আল্লাহ পবিত্র, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, আল্লাহ সবচেয়ে বড়।” (জামে তিরমিযী, হাদিস: ৩৪৬২)
এই আসমানি সফর আমাদের প্রমাণ দেয় যে, ইসলামের ইতিহাস ও শিক্ষা পূর্ববর্তী যুগের সকল নবীদের সমান শ্রদ্ধা এবং সম্মানের অধিকারী। নবীজির মিরাজের সফর শুধু তাঁর নিজের পক্ষে নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহান শিক্ষা ও পাথেয়। নবীজির উম্মতের জন্য রবের পক্ষ থেকে যে বার্তা এসেছে, তা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আমরা ইমানের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা লাভ করতে পারি।
লেখক: মুফতি মুখলিছুর রহমান
মুদাররিস: জামিআ আরাবিয়া আশরাফুল উলূম কুষ্টিয়া