ইরানে চলমান বিক্ষোভে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি হস্তক্ষেপ করলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালানো হবে বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে তেহরান। বুধবার জানুয়ারি ১৪ তারিখে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, এ বিষয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোকে আগেই অবহিত করেছে ইরান।
ওই কর্মকর্তা বলেন, যেসব প্রতিবেশী দেশে মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে—ওয়াশিংটন যদি ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। তার ভাষায়, এই সতর্কতা উপেক্ষা করলে এর দায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকেই নিতে হবে।
মার্কিন তিন কূটনীতিক রয়টার্সকে জানান, অঞ্চলটির প্রধান মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে গত বছর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যেভাবে বড় পরিসরে সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, এবার তেমন কোনো ব্যাপক প্রস্তুতির লক্ষণ দেখা যায়নি। তাদের একজন বলেন, এটি আদেশমূলক সরিয়ে নেওয়া নয়, বরং অবস্থান পরিবর্তন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে ধারাবাহিকভাবে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক দমন পীড়নে অন্তত ২,৬০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাদের মতে, এটি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানের ইতিহাসের অন্যতম বড় বিক্ষোভ আন্দোলন।
তিন কূটনীতিক জানান, বুধবার সন্ধ্যার মধ্যে কাতারের আল উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটি থেকে কিছু কর্মীকে সরে যেতে বলা হয়েছে। তবে গত বছর ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে যেভাবে কাছাকাছি স্টেডিয়াম ও শপিং মলে সেনা সরানো হয়েছিল, এবার সে ধরনের কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি। দোহার মার্কিন দূতাবাস ও কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি।
গত কয়েক দিন ধরেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইরানে হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়ে আসছেন। মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখা যাবে। একই দিনে তিনি ইরানিদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানান, তেহরান সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে হামলা চালানো থেকে বিরত রাখতে অনুরোধ করেছে। তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে লক্ষ্য করলে ওই দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানো হবে।
তিনি আরও বলেন, উত্তেজনা বাড়ায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থগিত হয়েছে। এক ইসরাইলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, মঙ্গলবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিরাপত্তা মন্ত্রিসভাকে ইরানে সরকার পতন বা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে ব্রিফ করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের উল্লেখযোগ্য সামরিক উপস্থিতি রয়েছে—কাতারের আল উদেইদে সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদর দপ্তর এবং বাহরাইনে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরসহ।
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান আলি লারিজানি কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও যোগাযোগ করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ভাষ্য অনুযায়ী, আরাগচি জানান পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরানিরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা এখন পর্যন্ত ২,৪০৩ বিক্ষোভকারী এবং সরকার সংশ্লিষ্ট ১৪৭ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। এক ইরানি কর্মকর্তা মঙ্গলবার রয়টার্সকে বলেন, মোট নিহতের সংখ্যা প্রায় ২,০০০। ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে উসকানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করে অংশগ্রহণকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়েছে।
এদিকে তেহরানে গ্রেফতারকৃত বিক্ষোভকারীদের রাখা একটি কারাগার পরিদর্শনে গিয়ে ইরানের প্রধান বিচারপতি দ্রুত বিচার ও শাস্তির আহ্বান জানান। এইচআরএএনএ জানায়, এখন পর্যন্ত ১৮,১৩৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে, বুধবার তেহরানে অস্থিরতায় নিহত ১০০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের বিক্ষোভগুলোর তুলনায় এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কারণ গত বছরের যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই এই অস্থিরতা শুরু হয়েছে এবং আঞ্চলিক সমীকরণেও পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এই উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলেছে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?