ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়াশিংটনকে জানিয়েছেন যে তেল আবিব কোনো অবস্থাতেই গাজা উপত্যকায় তুরস্কের উপস্থিতি মেনে নেবে না।
পার্সটুডে ও ইহুদিবাদী সংবাদমাধ্যম নিউজ ওয়ান–এর বরাতে জানা যায়, গত ২২ অক্টোবর অধিকৃত ফিলিস্তিন সফরের সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠকে নেতানিয়াহু স্পষ্টভাবে বলেন,
“গাজা উপত্যকায় তুরস্কের উপস্থিতি ইসরায়েলের জন্য লাল হুমকি।” তিনি জোর দিয়ে জানান, গাজায় যুদ্ধ-পরবর্তী যে বিকল্প সরকার গঠনের কথা চলছে, তাতে তুরস্ককে কোনোভাবেই স্থান দেওয়া হবে না।
তেল আবিবের দৃষ্টিতে তুরস্ক হামাসের অন্যতম প্রধান সমর্থক। আঙ্কারা একাধিকবার গাজা উপত্যকায় আন্তর্জাতিক ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা ইসরায়েল গাজার ভবিষ্যৎ সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য “গুরুতর হুমকি” বলে বিবেচনা করছে। বিশেষত প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের ইসরায়েলবিরোধী কড়া বক্তব্য এই আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়েছে।
তবে, এরদোগান সরকারের কঠোর অবস্থান সত্ত্বেও দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে। মা’আরিভ পত্রিকার তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে তুরস্ক থেকে অধিকৃত ফিলিস্তিনে পণ্য রপ্তানি প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার ছুঁয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়, এসব পণ্য বিকল্প রুটে—বিশেষ করে গ্রিসের মাধ্যমে—ইসরায়েলে পৌঁছেছে।
গাজায় তুরস্কের উপস্থিতির বিরুদ্ধে ইসরায়েলের পাঁচটি মূল কারণ
১. ঐতিহাসিক অবিশ্বাস ও কূটনৈতিক উত্তেজনা:
২০১০ সালের মাভি মারমারা হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ইসরায়েল-তুরস্ক সম্পর্ক গভীর অবিশ্বাসের মধ্যে রয়েছে। হামাসের প্রতি তুরস্কের সমর্থন ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তেল আবিব আঙ্কারাকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে “অবিশ্বস্ত পক্ষ” হিসেবে দেখে।
২. গাজার রাজনীতিতে তুর্কি প্রভাবের আশঙ্কা:
তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দিয়ে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইসরায়েল আশঙ্কা করছে, গাজায় তুরস্কের ভূমিকা ইসলামপন্থী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী করবে এবং হামাস নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করবে।
৩. যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি পরিকল্পনার সঙ্গে সংঘাত:
গাজা যুদ্ধের অবসান পরবর্তী পরিকল্পনা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অনুমোদিত দেশগুলোর সমন্বয়ে একটি বহুজাতিক বাহিনী গঠন হবে, যারা যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠন পর্যবেক্ষণ করবে। তুরস্ক এই বাহিনীতে অংশ নিতে চাইলে ইসরায়েল একে “লাল রেখা” বলে সতর্ক করেছে।
৪. নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা ঝুঁকি:
ইসরায়েল আশঙ্কা করছে, তুরস্কের সামরিক বা মানবিক মিশনের নামে গাজায় অবস্থান ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর কাছে সংবেদনশীল তথ্য পৌঁছে দিতে পারে। তুরস্কের অতীত রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা এই শঙ্কাকে আরও তীব্র করেছে।
৫. আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা:
গাজায় তুরস্কের উপস্থিতি পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েল, মিশর, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আঙ্কারার প্রতিযোগিতার অংশ। ইসরায়েল চায় না, যুদ্ধ-পরবর্তী সমীকরণে তুরস্কের প্রভাব বৃদ্ধি পাক, কারণ এতে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য আঙ্কারার দিকে ঝুঁকে যেতে পারে।
সার্বিকভাবে, গাজায় তুরস্কের উপস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের বিরোধিতা কেবল কূটনৈতিক বা দ্বিপাক্ষিক পার্থক্যের কারণেই নয়—বরং এটি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নিরাপত্তা উদ্বেগ ও গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণের জটিল প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?