দিন যত গেলই তিক্ততার স্রোত জোরালো হচ্ছে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে, সীমান্তে সংঘর্ষের জেরে দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বাড়ছে। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আফগান ভূখণ্ডে ঢুকে পাকিস্তানের পরিচালিত বিমান হামলা ও বিরতিহীন গোলাগুলিতে আফগান জনগণ ফুঁসে উঠেছে এবং দেশটির বিভিন্ন প্রদেশের রাজধানী শহরগুলি বিক্ষোভে গমগম করছে। ৯ অক্টোবর প্রথম দিনের হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুতীভূতভাবে অবনতি ঘটে এবং প্রতিদিনই বিক্ষোভ বড় হচ্ছে।
বিক্ষোভকারীরা তাদের ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, ‘পাকিস্তান একটি আগ্রাসি রাষ্ট্র। যদি সরকার অনুমতি দেয় তবে প্রয়োজনে তারা সীমান্তে গিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামবে।’ এই ধরণের প্রতিক্রিয়া এমন এক পরিস্থিতির প্রতিফলন যেখানে সীমান্ত পাড়ের জনজীবন আজ আতঙ্কাচ্ছন্ন। এ আবেগের মধ্যেই সীমান্তে পাকিস্তান আবারও নতুন করে বিমান হামলা চালায় এবং সেখানে শান্তির প্রত্যাশা ভেঙে পড়ে। একই দিনে দুই দেশের নেতৃত্ব দোহায় যুদ্ধে বিরতি ও আলোচনার প্রয়াসে পৌঁছালেও মাঠের উত্তেজনা কাটছে না।
শুক্রবার রাত আটটার পরে ৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ঘন্টার মধ্যে পাকতিকা প্রদেশের উরুগুন ও বারমাল জেলায় পাকিস্তানের বিমান হামলায় মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সূত্রের আদলে জানানো হয়, হামলায় ১৭ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আরও ১৬ জন আহত হয়েছেন। সরকারি হিসেবে নিহত তালিকায় ১০ জন এবং আহত ১২ জন বলা হলেও মরনঘাতী আঘাতের শিকারদের মধ্যে স্থানীয় ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রাও রয়েছেন; নারী ও শিশুও রয়েছেন নিহতের তালিকায়। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তিনজন খেলোয়াড় কবির, সিবগাতুল্লাহ ও হারুন নিহতের কথা নিশ্চিত করে এবং প্রতিবাদ হিসেবে নভেম্বরে হওয়া ত্রিদেশীয় টি টোয়েন্টি সিরিজ থেকে প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়। সিরিজটি বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকা অংশ নেওয়ার কথা ছিল এবং পাকিস্তানের মাঠে আয়োজন হওয়ার কথা ছিল।
রাজধানী কাবুল থেকে শুরু করে খোস্ত, পাকতিয়া, পাকতিকা, নাঙ্গারহার, বাদাখশান ও বাগলান পর্যন্ত শহরগুলোতে প্রতিদিন পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান তুলছে হাজার হাজার মানুষ। যুদ্ধবিরতির ৪৮ ঘণ্টার সময় সামান্য স্বস্তি থাকলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতে আতঙ্ক এবং বাসিন্দাদের পলায়ন নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে; মানুষ তাদের আস্তানা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছে। এরই মধ্যে সীমান্তের ওপারেও জঙ্গি সংগঠনের হামলা ঘটেছে; পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের উত্তর ওয়াজিরিস্তানের একটি সেনা ক্যাম্পে তেহরিক-ই তালেবার অপপ্রচেষ্টায় সন্ত্রাসী হামলায় সাত পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে এবং নয় আহত হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
কূটনৈতিক মঞ্চে দুই দেশ আলোচনায় বসেছে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাতারের রাজধানী দোহায় উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা চলছিল। ইসলামিক আমিরাত অব আফগানিস্তানের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এক বিবৃতিতে জানান, প্রতিরক্ষামন্ত্রী মৌলবি মোহাম্মদ ইয়াকুব মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল দোহার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছে। প্রতিনিধি দলে গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক, গুয়ান্তানামো বে-এর সাবেক বন্দি মোল্লা আব্দুল হক ওয়াসিক ও আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। পাকিস্তান থেকে প্রতিনিধিত্ব করছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ ও আইএসআই প্রধান আসিম মালিক। মুজাহিদ এই হামলাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং বলেন, আফগানিস্তান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং আলোচনা চলাকালীন প্রতিশোধমূলক কোনো হামলা চালাবে না।
অবশ্য মাঠের বাস্তবতা আলাদা; সীমান্তের আতঙ্ক সারা দেশে পাকিস্তানবিরোধী ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে এবং রাজনৈতিক নেতারা ও সাধারণ মানুষ দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা মোকাবিলায় সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলমান এই উত্তেজনা ন্যায্য সীমান্ত নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সমন্বয়, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কূটনৈতিক মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করছে; না হলে সীমান্ত উভয়পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?