যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা অ্যাবি মার্টিনের কঠোর সমালোচনার পর গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা ও গাজা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে বিতর্ক তীব্র হলো। পার্স টুডে সংবাদে এবং তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলুর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি সরাসরি বলেছেন,
“গাজার জন্য মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে যাত্রা করা ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’-এর কর্মীদের সঙ্গে ইসরায়েলের যে আচরণ, তা প্রমাণ করে যে তেল আবিব সম্পূর্ণভাবে শাস্তির ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে।” এই এক বাক্যই কেবল ইসরায়েলের কৌশল ও আন্তর্জাতিক নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেনি, বিশ্ব ব্যাপী মানবাধিকার ক্ষেত্রেও এক বিতর্ককেন্দ্র সৃষ্টি করেছে।
অ্যাবি মার্টিন বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর নীরবতা ও তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, “পরিচিত ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে অপমানজনক আচরণ, তাঁদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে উপহাস করা এবং মৌলিক মানবাধিকার অস্বীকার করা—এসবই এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যা ক্ষমতা ও গণহত্যার নেশায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে।” তারنانী অভিযোগগুলো কেবল জোরালো ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়; মার্টিন এখানে আন্তর্জাতিক প্রচলিত কূটনীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি এক ঘোর প্রতিধ্বনি তুলে ধরেছেন।
আরও বিস্ফোরক বক্তব্যে তিনি গাজার ওপর নৃশংসতার ছবি চিত্রিত করে বলেন,
“সেখানে যে বর্বরতা চলছে, তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যার বর্ণনা দিতে ভাষা যথেষ্ট নয়। গত দুই বছরে গাজায় যা ঘটেছে, তা ইতিহাসের বইয়ে পড়া বা ছবিতে দেখা যে কোনো ঘটনার সীমা ছাড়িয়ে গেছে।”
এই সমালোচনার সঙ্গে মার্টিনের আপত্তি যে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রায়ই সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে, তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও তাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য এক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা দাবি করে যে, তারা গণহত্যার মতো বিপর্যয় ঠেকাতে চায়—বাস্তবে তারা সাম্রাজ্যবাদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে এবং নিজেদের মানবতা হারিয়ে ফেলেছে।”
অ্যাবি মার্টিন আরও বলেন, গাজায় যে গণহত্যা ও গণহত্যার চিহ্ন রয়েছে তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্তদের বিচারের দাবি তুলে তিনি বলেন,
“২০০ জনেরও বেশি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী, তাদের অনেকেই পরিবার-পরিজনসহ, সুপরিকল্পনা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় বোর্ডকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনের সঙ্গে হেগ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত, কারণ তারাও এই গণহত্যার সহযোগী।”
এই তীব্র বিবৃতি আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও সাংবাদিক স্বাধীনতার ওপর যে আলোচনাকে ঝাঁকুনি দিয়েছে, তা নিম্নতলার নয়।
মার্টিনের অভিযোগের যে প্রেক্ষিতটা সবচেয়ে উদ্বেগজনক তা হলো তাঁর বক্তব্য যে পশ্চিমা গণমাধ্যম একাধারে কর্পোরেট ফান্ডিং ও রাজনৈতিক চাপের ফলশ্রুতিতে নিরপেক্ষতা হারিয়েছে। তিনি বলেন, “পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো ব্যাংক, তেল কোম্পানি ও অস্ত্র শিল্পের টাকায় পরিচালিত হয়। যে সাংবাদিকরা ইহুদিবাদের পক্ষে কথা বলেন না কিংবা ফিলিস্তিন নিয়ে নিজেদের মতামত গোপন করেন না—তাদের চাকরি হারাতে হয়।” এই অভিযোগটি মিডিয়া স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার বিবেচনায় গর্জে ওঠা প্রশ্ন তোলে।
দূরপ্রসারী সতর্কতাও দিয়েছেন মার্টিন:
“যদি কেউ মনে করে এই পরিস্থিতি শুধু গাজা পর্যন্ত সীমিত থাকবে, তবে তারা ভুল করছে। গাজা এখন এমন এক পরীক্ষাগার, যার মাধ্যমে বিশ্বের বাকি অংশের উপরও নতুন ‘নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা’ চাপিয়ে দেওয়া হবে।”
এই কথা কেবল স্থানীয় সংকট নয়—এটি একটি বিশ্বব্যাপী কৌশলগত ও নৈতিক সংকট হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তিনি।
শেষাংশে মার্টিন পশ্চিমা সমাজ তথা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞার উদাহরণ স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলছেন, স্বীকৃত ইতিহাস যেমন দেখায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর এক আন্দোলন, ঠিক তেমনি এখনই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অস্ত্র, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও একাডেমিক বয়কট আরোপের মাধ্যমে চাপ গঠন করা উচিত। তাঁর ভাষায়,
“যেভাবে বিশ্ব একসময় দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল, ঠিক সেভাবেই এখন ইসরাইলি দমননীতির বিরুদ্ধেও চাপ তৈরি করতে হবে।”
অ্যাবি মার্টিনের এই বক্তব্যগুলো কেবল তীব্র ব্যাখ্যা নয়; তারা আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারক, মানবাধিকার সংস্থা, মিডিয়া এবং সাধারণ জনমতের কাছে এক জোরালো আহ্বান। গাজা ও ফ্লোটিলা ইস্যুতে তার বক্তব্য যে তেল আবিবকে ‘শাস্তির ঊর্ধ্বে’ অবস্থানকারী হিসেবে চিত্রিত করছে, তা আন্তর্জাতিক ন্যায়-নীতি ও সামরিক নীতির ওপর এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অনেকে বলছে, এসব দাবি তদন্ত ও বিচার দাবি করে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যথার্থ ও তৎপর প্রতিক্রিয়ার ওপরই ভবিষ্যৎ মানবাধিকার রক্ষার নির্ণয় নির্ভর করবে।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?