দক্ষিণ এশিয়ার রাজপথে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে বহু আগে থেকেই। বাংলাদেশে একের পর এক আন্দোলন, নেপালের অস্থিতিশীলতা কিংবা শ্রীলংকার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে জনতার ঝড়ে ক্ষমতার আসন কেঁপে উঠেছে। সেই একই চিত্র এবার ভারতজুড়ে। উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম—প্রতিটি অঙ্গনে জনতার ক্ষোভ আর বিক্ষোভ মোদি সরকারের ভিত্তিকে কাঁপিয়ে তুলছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা মণিপুরে। টানা দুই বছর ধরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রাণ গেছে আড়াইশরও বেশি মানুষের, বাস্তুচ্যুত ষাট হাজারেরও বেশি। আজও তাঁরা শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। গত বছর থেকে সেখানে রাষ্ট্রপতি শাসন চলছে। বিরোধীদের অভিযোগ, মোদি সরকার ইচ্ছে করেই দুই সম্প্রদায়কে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, মণিপুরের মানুষ মরছে, ঘরছাড়া হচ্ছে, অথচ সরকার ভোটের অঙ্ক কষা ছাড়া কিছুই করছে না। প্রিয়াংকা গান্ধীর ক্ষোভ, প্রধানমন্ত্রী একদিনও সেখানে গিয়ে মানুষের চোখের জল মুছতে পারেননি। কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে তোপ দাগেন, উন্নয়নের নামে প্রকল্প উদ্বোধন হয়, কিন্তু রক্তাক্ত মণিপুরের পাশে দাঁড়াতে সরকার অক্ষম।
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রতিবাদের আগুন এবার আসামে। নাগরিকপঞ্জি ও নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বাংলাভাষী পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। তালিকা থেকে নাম মুছে ফেলার ভয় তাদেরকে প্রতিদিন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সম্প্রতি ছাত্র সংগঠন ও নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো রাস্তায় নেমেছে, স্লোগান তুলছে—“আমরা ভারতীয়, আমাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া চলবে না।” এর মধ্যেই একাধিক মানবাধিকার কর্মীর গ্রেফতার পরিস্থিতিকে আরও অস্থির করেছে।
বিহারেও জনরোষ। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিক্ষোভ দানা বেঁধেছে। বিরোধীরা বলছে, এটি আসলে ভোটচুরির বৈধ প্রক্রিয়া। রাজধানী পাটনা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত চলছে অবরোধ, অনশন, বিক্ষোভ। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী সতর্ক করেছেন, এটি গণতন্ত্র ধ্বংসের অস্ত্র। আদালত পর্যন্ত মন্তব্য করেছে, যথাযথ সুযোগ না দিয়ে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া যাবে না। এতে আন্দোলনের শক্তি আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে মমতা ব্যানার্জি অভিযোগ করেছেন, বিজেপি উত্তর-পূর্ব থেকে বিহার পর্যন্ত বিরোধী কণ্ঠরোধ করছে। বাংলাভাষীদের বাংলাদেশি বলে অপমান করা হচ্ছে, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আসাদুদ্দিন ওয়েইসিও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই সরকার মুসলমান, দলিত, উত্তর-পূর্ব ও বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতেছে। আজ প্রতিবাদ না করলে আগামীকাল কেউ নিরাপদ থাকবে না।
দক্ষিণ ভারতেও বিজেপি-বিরোধী স্লোগান জোরদার। অভিনেতা থেকে রাজনীতিক হওয়া বিজয় সরাসরি আক্রমণ করে বলেছেন, চোল ঐতিহ্যের নামে নাটক মঞ্চস্থ করে বিজেপি ভোট চাইছে। খননকার্যের সত্য গোপন করা হচ্ছে। তার দল ঘোষণা করেছে—বিজেপির সঙ্গে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।
এদিকে ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৫তম জন্মদিন কেটে গেছে প্রায় নীরবতায়। দলের ভেতরেও বড় কোনো আয়োজন দেখা যায়নি। বিজেপির অভ্যন্তরে অনেকে বলছেন, এটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে—মোদি এখন নিজের দলের ভেতরেও অনেকটা একঘরে। বিরোধীরা বলছে, যে নেতা নিজের জন্মদিনে দলের কাছ থেকে সম্মান পান না, তার জনপ্রিয়তা যে তলানিতে নেমে গেছে, তা স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে ভারতজুড়ে অস্থিরতা ও ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। কর্মসংস্থানের অভাব, মূল্যবৃদ্ধি, মণিপুরের রক্তপাত, আসামের নাগরিকপঞ্জি আতঙ্ক, বিহারের ভোটার তালিকা বাদ পড়ার মতো ইস্যুতে সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ। বিরোধীরা এই ক্ষোভকে সংগঠিত করে নতুন আন্দোলনের জোয়ার তৈরি করতে চাইছে। রাহুল, প্রিয়াংকা, খাড়গে, মমতা, ওয়েইসি কিংবা দক্ষিণ ভারতের নতুন নেতৃত্ব—সবাই এক সুরে বলছেন, ভারতও দক্ষিণ এশিয়ার গণবিক্ষোভ থেকে মুক্ত নয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদি উন্নয়নের বুলি আওড়ালেও বাস্তবতা দেখাচ্ছে অন্য চিত্র। বিরোধীরা দৃঢ়ভাবে বলছে, জনতার ক্ষোভে ক্ষমতার আসন কেঁপে উঠছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিক্ষোভের ঢেউ এখন ভারতের জন্য বড় সতর্কবার্তা।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?