সর্বস্তরের জনগণের উপস্থিতিতে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা জোর দিয়ে বলেছেন: জনগণ, কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর ইস্পাত কঠিন ঐক্যকে বিনষ্ট করা যাবে না।
আজ, শনিবার সকালে, বিশ্বের শিয়া মুসলমানদের অষ্টম ইমাম হযরত আলী ইবনে মুসা আল-রেজা (আ.)-এর শাহাদাত বার্ষিকীতে, বিভিন্ন স্তরের হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে এক ভাষণে, ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা “আহলে বাইতের চিন্তাধারার অসাধারণ প্রসার” এবং “আশুরার শিক্ষার বিস্তার ও মুসলিম বিশ্বে ইমাম হোসাইনের অভ্যুত্থানের দর্শন”কে অষ্টম ইমামের খোরাসান সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেয়ামত বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বর্তমানে চলমান কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ইরানের শত্রুরা আমাদের জনগণ, কর্মকর্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর সুদৃঢ় ঐক্য এবং সামরিক শক্তি ও পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা দেখে বুঝতে পেরেছে যে যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানি জাতি এবং ইসলামী শাসন ব্যবস্থাকে নতজানু করা যাবে না। তাই, তারা এখন ইরানের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করে সরকারকে নতজানু করার লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদেরকে সমস্ত শক্তি দিয়ে “জাতির পবিত্রতা ও মহান ঐক্যকে ধরে রাখতে হবে এবং শক্তিশালী করতে হবে।
পার্সটুডে জানিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী তার ভাষণের প্রথম অংশে, অষ্টম ইমামকে সমগ্র মানবতার জন্য, বিশেষ করে ইরানিদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ইমাম রেজার খোরাসানে আগমণের অসামান্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করে বলেছেন: শহীদদের নেতা ইমাম হোসেন (আ.)-এর শাহাদাতের পর ইমাম রেজার এই অঞ্চলে আগমণের ফলে দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্ন ও নির্যাতিত আহলে বাইতের অনুসারীরা বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে এসেছে এবং শিয়ারা তথা আহলে বাইতের অনুসারীরা এমনভাবে প্রাণ ফিরে পেয়েছে যা ইতিহাসে শিয়া চিন্তাধারাকে সংরক্ষণ করতে এবং প্রতিদিন আহলে বাইত ও তাদের অনুসারীদের প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা রেখেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা অষ্টম ইমামের খোরাসান সফরের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে আশুরার চেতনা আরো শক্তিশালী হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন: আশুরা বিপ্লবের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হযরত আলী ইবনে মুসা আল-রেজা (আ.) অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার এবং মুসলিম সমাজে অসৎ ও দুর্নীতিগ্রস্তদের মেনে না নেয়ার আহ্বান জানান। এভাবে তিনি জনগণের মধ্যে ইসলামের অনেক সামাজিক শিক্ষার ব্যাখ্যা এবং প্রচারের পথ প্রশস্ত করেছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তাঁর বক্তৃতায়, সম্প্রতি ইসরায়েলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে ইরানি জাতির পূর্ণ শক্তি ও দৃঢ়তাকে আমাদের দ্বিগুণ মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ হিসাবে উল্লেখ করে প্রশ্ন করেছেন: গত ৪৫ বছর ধরে ইরানের প্রতি আমেরিকার সব সরকারের শত্রুতার কারণ আসলে কী?
আপাতদৃষ্টিতে সহজ কিন্তু জটিল এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন: অতীতে, আমেরিকানরা সন্ত্রাসবাদ, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, নারী প্রভৃতি বিষয়কে অজুহাত করে তারা শত্রুতার আসল কারণ লুকিয়ে রেখেছিল, অথবা তারা খুব বেশি হলে ভদ্রভাবে এটা বলতো যে তারা ইরানের আচরণ পরিবর্তন করতে চায়, কিন্তু আজ আমেরিকার ক্ষমতায় থাকা এই ব্যক্তি ইরানের প্রতি শত্রুতার আসল কারণ প্রকাশ্যে এনেছেন এবং বলেছেন, “আমরা চাই ইরান আমাদের কথা শুনুক। অর্থাৎ আমরা আসলে চাই ইরানি জাতি এবং ইসলামী সরকার আমাদের নির্দেশ মেনে চলুক।
মার্কিন সরকারের এই অশুভ লক্ষ্য গভীরভাবে বোঝার ওপর গুরুত্বারোপ করে ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা বলেন: তারা চায় ইতিহাস ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ইরানের মতো একটি মর্যাদাবান ও গর্বিত জাতি আমেরিকার আদেশ মেনে চলুক।
যারা বলে যে মার্কিন সরকারের ক্রোধ এবং শত্রুতার কারণ ইরানি জাতির (আমেরিকা বিরোধী) স্লোগান, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা তাদেরকে অতি সরলমনা বলে অভিহিত করে আরও বলেছেন: যারা বলে, “কেন তোমরা আমেরিকার সাথে সরাসরি আলোচনা করো না এবং সমস্যার সমাধান করো না?” তারা আসলে খুবই সরল মানুষ, কারণ সাদা চোখে আমরা যা দেখি তার বাইরে অন্য কারণ রয়েছে এবং যেসব বিষয় নিয়ে এতো শত্রুতা তা সমাধানযোগ্য নয়।
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী ইরানি জাতিকে নতজানু হয়ে আমেরিকার কথা মেনে চলার দাবিকে ইরানিদের জন্য অপমানজনক বলে অভিহিত করে বলেছেন: ইরানি জাতি এই ধরণের কুৎসিত ও অপমানজনক দাবিতে গভীরভাবে ক্ষুব্ধ এবং এর বিরুদ্ধে তারা শক্ত অবস্থান নেবে। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক যুদ্ধের আসল কারণকে আমেরিকার ওই প্রত্যাশা বা দাবি আদায়ের চেষ্টা হিসাবে উল্লেখ করে বলেন: তারা ইরানকে ধ্বংস করতে ইসরায়েলকে উস্কে দিয়েছে এবং সর্বাত্মক সাহায্য করেছে। কিন্তু তারা কল্পনাও করেনি যে ইরানি জাতি তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এবং এমন আঘাত হানবে যে তারা অনুতপ্ত হবে।
যুদ্ধ শুরুর একদিন পর, ইরানের ইসলামি সরকার উৎখাত হওয়ার পর নতুন সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করার জন্য ইউরোপে বেশ কয়েকজন আমেরিকান ভাড়াটে এজেন্টের সমবেত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিপ্লবের নেতা বলেন: তারা তাদের বোকামি ও হাস্যকর লক্ষ্য অর্জনে এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে আক্রমণ শুরুর একদিন পরেই তারা ইরানে নতুন সরকার গঠনের জন্য সভা করে একজন রাজা নিযুক্ত করে।
ওই বোকাদের মধ্যে একজন ইরানীর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ী বলেন: ‘লজ্জা হওয়া উচিত সেই ইরানীর যে তার দেশের বিরুদ্ধে এবং ইহুদিবাদ এবং আমেরিকার পক্ষে কাজ করে।’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা জনগণ এবং সরকারের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি করাকে আমাদের শত্রু এবং তাদের অনুচরদের আরেকটি ভ্রান্ত ধারণা হিসাবে উল্লেখ করে বলেছেন: সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনীর পাশে থেকে জনগণ শত্রুর মুখে চপেটাঘাত করেছে।
সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি প্রদর্শন শত্রুদের সব হিসাব নিকাশ পাল্টে দিয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন: “আমরা এবং সমগ্র ইরানি জাতি সশস্ত্র বাহিনীর কাছে কৃতজ্ঞ এবং ইরান, সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও সক্ষমতা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে।”
আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে ইরানকে নতজানু করতে শত্রুরা ব্যর্থ হয়েছে জানিয়ে বলেন: “এই শত্রুতা সত্ত্বেও, গত ৪৫ বছরে ইসলামী ইরান দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং শত্রুরা ইরানকে সামরিক উপায়ে কাবু করতে পারবে না জেনে এখন ইরানের অভ্যন্তরে বিভেদ তৈরির চেষ্টা করছে।”
তিনি বলেন, আজ আল্লাহর রহমতে জনগণ ঐক্যবদ্ধ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা ক্ষেত্রে মতভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও, তারা ইসলামি সরকার ব্যবস্থা ও দেশকে রক্ষা করার এবং শত্রুর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে ঐক্যবদ্ধ। তিনি জাতীয় ঐক্য রক্ষা করাকে একটি সার্বজনীন কর্তব্য বলে উল্লেখ করেন।
বিপ্লবের নেতা ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণ্য শাসনব্যবস্থা হিসাবে অভিহিত করে বলেছেন: আজ, এমনকি ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা সরকারগুলো, যারা সবসময় ইসরায়েলকে সমর্থন করে আসছে, তারাও ইসরায়েলকে নিন্দা করছে; যদিও এই নিন্দাজ্ঞাপন লোক দেখানো এবং অর্থহীন।
তিনি বলেন, ইসরায়েলি নেতাদের বর্তমান অপরাধী কর্মকাণ্ড যেমন অনাহারে ও তৃষ্ণার্ত রেখে শিশুদের হত্যা করা এবং খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য করা যা মানব ইতিহাসে নজিরবিহীন। তিনি বলেন আমাদের অবশ্যই এই জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে; অবশ্য, মুখে নিন্দা জানিয়ে কোনও লাভ নেই বরং, ইয়েমেনের সাহসী জনগণের মতো আমাদের অবশ্যই ইসরায়েলে সব দিক থেকে সাহায্য আসার পথ বন্ধ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
পরিশেষে, আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এই বিষয়ে যেকোনো সম্ভাব্য পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ইরানের প্রস্তুতি ঘোষণা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে সর্বশক্তিমান আল্লাহর সহায়তায় ইরানী জাতি এবং বিশ্বের সমস্ত ন্যায়পরায় শক্তি , এই অঞ্চল থেকে ইসরায়েল নামক মারাত্মক ক্যান্সারকে উৎপাটন করবে এবং মুসলিম জাতিগুলো জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ হবে।
সূত্রঃ পার্সটুডে
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?