গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকায় এবং এই অঞ্চলে মানবিক সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিদিন কয়েক ডজন গাজাবাসী প্রাণ হারাচ্ছে কেবল ইসরায়েলি সামরিক গুলিবর্ষণের কারণেই নয় ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কারণেও।ইসরায়েল গাজার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক স্থানান্তরের জন্য বেশ কয়েকটি আফ্রিকান দেশের সাথে আলোচনা করছে।
গাজার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক অন্য দেশে স্থানান্তরের বিষয়টি এমন একটি নীতি যা ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে জোর দিয়ে আসছে বিশেষ করে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তাদের এ অশুভ তৎপরতা বেড়েছে। একসময় গাজা যুদ্ধের মাধ্যমে ইহুদিবাদী শাসনব্যবস্থার একটি চরম জাতীয়তাবাদী কল্পনা হিসেবে বিবেচিত হত এবং ট্রাম্প গাজা সংকটের সমাধান হিসেবে এটি প্রস্তাব করার পর থেকে এই ধারণাটি ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী ধারণার ক্ষেত্র থেকে ইসরায়েলি নীতিতে একটি কার্যকরী কৌশলে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এখন মনে হচ্ছে ইহুদিবাদী শাসনব্যবস্থা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তনের আশায় এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
যদিও গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা এবং ফিলিস্তিনকে সমর্থনকারী দেশগুলো শুরু থেকেই এই পরিকল্পনার বিরোধিতা করে আসছে যার ফলে ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর সমর্থক অনেক দেশও এই পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং তারা ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে থাকার আইনি অধিকারের উপর জোর দিয়েছে এবং অনেক মানবাধিকার গোষ্ঠীও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে যে ফিলিস্তিনিদের তাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য করা বা চাপ দেওয়া একটি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হতে পারে; তবে, ইহুদিবাদী সরকার এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য জোর দিয়ে চলেছে এবং এখন আফ্রিকান দেশগুলোকে গাজা শরণার্থীদের গ্রহণের জন্য সম্ভাব্য গন্তব্য হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে। এই দেশগুলোকে বেছে নেওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। এর একটি কারণ হল তাদের ভৌগোলিক নৈকট্য এবং গাজায় সহজ প্রবেশাধিকার। কিছু আফ্রিকান দেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় গাজার কাছাকাছি, এবং এই দেশগুলোতে লোক স্থানান্তর করতে কম খরচ হবে।
অন্যদিকে, অনেক আফ্রিকান দেশ পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা থেকে উপকৃত হতে ইচ্ছুক। অতএব, ইসরায়েলের সাথে তাদের সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণ করা এই সম্পর্কগুলোকে শক্তিশালী করার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা থেকে উপকৃত হওয়ার একটি উপায় হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এই দেশগুলা গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণকে আন্তর্জাতিক সাহায্য এবং সমর্থন পাওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
বর্তমানে ইহুদিবাদী ইসরায়েল এবং তার পশ্চিমা সমর্থকরা উপনিবেশবাদের এক নতুন রূপে কিছু আফ্রিকান দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সুযোগ নিচ্ছে এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। যদিও অনেক আফ্রিকান দেশ এই বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে এবং এটি প্রত্যাখ্যান করেছে।
যাইহোক, সংবাদ সূত্রগুলো গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণের জন্য ইসরায়েল এবং দক্ষিণ সুদানের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনার খবর দিয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ সুদান এখনও তেল আবিব কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনায় কেন? দক্ষিণ সুদান যা ২০১১ সালে সুদান থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন দেশে পরিণত হয়েছিল আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে নাজুক অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির দেশগুলো মধ্যে একটি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটি দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধ, মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তবে, দক্ষিণ সুদান সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের সাথে তার সম্পর্ক প্রসারিত করেছে এবং এখন মনে হচ্ছে গাজার বাসিন্দাদের গ্রহণ করাকে ইসরায়েলের সাথে তার সম্পর্ক শক্তিশালী করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে, যার মাধ্যমে এটি তেল আবিব থেকে আরও সাহায্য পেতে পারে।
গাজার বাসিন্দাদের বহিষ্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে কেবল গাজা দখল ও দখলের ইসরায়েলের লক্ষ্যই পূরণ হচ্ছে না বরং আফ্রিকায় ইসরায়েলের প্রভাব আরও সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
যদিও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং তারা ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার নীতি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে বলে আশা করছে বাস্তবে এই নীতি একটি নিষ্ফল প্রচেষ্টা। গাজার বাসিন্দারা সর্বদা তাদের ভূমিতে থাকার তাদের আইনি অধিকারের উপর জোর দিয়ে এসেছে এবং এই ক্ষেত্রে, বিশ্বব্যাপী জনমতও যেকোনো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি নীতিকে মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী বলে মনে করে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর নিন্দা করে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে ঘোষণা করেছে: গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালার পরিপন্থী এবং ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য এর বিপর্যয়কর পরিণতি হবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে জোর দিয়ে বলেছেন, গাজা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমিতে বসবাসের অধিকার রয়েছে; আমরা গাজার বাসিন্দাদের যেকোনো জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি প্রত্যাখ্যান করি এবং এটিকে জাতিগত নির্মূল বলে বিবেচনা করি।
অন্যদিকে, বিদেশীদের উপস্থিতিতে উপনিবেশবাদ এবং গৃহযুদ্ধের যুগের অভিজ্ঞতা অর্জনকারী অনেক আফ্রিকান দেশ এখন এই ধরনের নীতি গ্রহণ করতে রাজি নয়।
এই ক্ষেত্রে, ইসরায়েলের নীতি কেবল চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হবে না, বরং পশ্চিম এশীয় অঞ্চলে মানবিক সংকট এবং অবিশ্বাসকে আরও গভীর করবে; অন্যদিকে এই ধরনের পরিকল্পনার মাধ্যমে আফ্রিকায় ইসরায়েলের প্রভাব সম্প্রসারণ কেবল কৃষ্ণাঙ্গ মহাদেশে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে এবং আফ্রিকার জটিলতা ও সমস্যাগুলোকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে।
সূত্রঃ পার্সটুডে
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?