বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বললেই হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় রাজনীতিবিদদের পিত্তি গলে। ভালো-মন্দ, যুক্তি-বিজ্ঞান, প্রতিবেশী সম্পর্ক কিংবা কূটনৈতিক সৌজন্য—কোনো কিছু বিবেচনা না করেই বাংলাদেশবিরোধী বিষোদ্গার যেন তাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এর জ্বলন্ত প্রমাণ হয়ে উঠেছেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুই বিতর্কিত নেতা—ত্রিপুরার প্রদ্যোৎ মাণিক্য দেববর্মা এবং আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
এই দুইজন এমন সব উগ্র, ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্য করেছেন, যা শুধু প্রতিবেশী দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ নয়—বরং সরাসরি হিন্দুত্ববাদী অহমিকার নগ্ন প্রকাশ।
প্রদ্যোৎ মাণিক্য দেববর্মা সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন সব কথা বলেছেন যা রাজনৈতিক শিষ্টাচার তো দূরের কথা, সাধারণ কূটনৈতিক শালীনতারও চরম লঙ্ঘন। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ভারতের উচিত ‘বাংলাদেশের কিছু অংশ দখল করে নেয়া’। কারণ তার দাবি, ‘ওই অংশ সবসময় ভারতেরই হতে চেয়েছে’। তিনি আরো বলেন, এতে ভারতের ‘সাগরপথ পাওয়া সহজ হবে’ এবং ‘শত শত কোটি টাকা খরচ না করেও’ সমস্যার সমাধান হবে।
এই ধরনের মন্তব্য ভারতীয় আগ্রাসী মানসিকতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। প্রদ্যোৎ মাণিক্যদের কাছে ইতিহাসের সত্য, স্বাধীনতার ত্যাগ, ও জাতীয় মর্যাদা যেন মূল্যহীন। যারা নিজেদের “আদিবাসী স্বার্থ” রক্ষার নামে স্বাধীন বাংলাদেশকে টুকরো করার হুমকি দেয়, তারা আদতে হিন্দুত্ববাদী চেতনার মোড়কে জঙ্গিবাদী রাজনীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরে দেওয়া বক্তব্য ছিল একেবারেই বাস্তবভিত্তিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতামূলক। তিনি বলেন, “ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্য স্থলবেষ্টিত, যাদের সমুদ্রপথ নেই—বাংলাদেশই তাদের জন্য একমাত্র সমুদ্রপথের সম্ভাব্য অভিভাবক।” তিনি কোনো হুমকি দেননি, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক আন্তঃসম্পর্কের সম্ভাবনার কথাই বলেছেন। এমনকি তিনি এও বলেন, “নেপাল ও ভুটানও স্থলবেষ্টিত, এবং এই পুরো অঞ্চলে যদি আন্তঃযোগাযোগ গড়ে ওঠে, তাতে বাণিজ্য ও স্থিতিশীলতা—দুই-ই উপকৃত হবে।”
কিন্তু এই বক্তব্যের গভীরতা অনুধাবন না করে প্রদ্যোৎ মাণিক্য ও হিমন্ত বিশ্বশর্মা উল্টো রণচণ্ডী হয়ে উঠেছেন। তাদের মতো হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের কাছে আঞ্চলিক সংহতি, কূটনৈতিক সৌজন্য, এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো—সবই যেন গালি।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা তো আরও একধাপ এগিয়ে ইউনূসের মন্তব্যকে “আপত্তিকর” এবং “নিন্দনীয়” বলে ঘোষণা দিয়ে ‘চিকেনস নেক’ করিডরের চারপাশে আরও শক্তিশালী রেল ও সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরির ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বিকল্প পথ তৈরি করতে হবে—যেন বাংলাদেশ নামক প্রতিবেশী রাষ্ট্রের প্রয়োজনই না পড়ে।
এই সব বক্তব্য আসলে হিন্দুত্ববাদী পররাষ্ট্রনীতির অন্ধ চেহারা তুলে ধরে, যেখানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে সৌহার্দ্য নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ, সন্দেহ ও দখলের রাজনীতি চলে।
প্রদ্যোৎ মাণিক্যের মূর্খতা আরও চরমে পৌঁছায় যখন তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ আমাদের বন্ধু নয়। শেখ মুজিবই ছিল একমাত্র বন্ধু।’ অর্থাৎ, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার, জনগণ, এবং রাজনীতি—সবই তাদের চোখে শত্রু! অথচ বাংলাদেশ প্রতিটি দুর্যোগে ভারতকে সহায়তা করেছে, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, সীমান্তে কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।
এই দুই নেতার বক্তব্য শুধু প্রতিবেশী বাংলাদেশ নয়—ভারতের নিজস্ব যুক্তিবোধ ও রাজনীতিকেও ছোট করেছে। একদিকে যখন ড. ইউনূসের মতো আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি আঞ্চলিক অগ্রগতির রূপরেখা উপস্থাপন করছেন, তখন হিমন্ত-প্রদ্যোৎরা চিৎকার করে নিজেদের উন্মত্ততাকে উপহাসে পরিণত করছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা, ভূখণ্ড ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলার আগে ভারতের এসব মূর্খ নেতাদের জেনে রাখা উচিত—বাংলাদেশ কোনো দয়া করা দেশ নয়। এটি রক্তে কেনা স্বাধীনতা, এখানে কারও হুমকি-ধমকিতে মাথা নোয়ানোর সংস্কৃতি নেই।

জয় ও নিঝুম মজুমদারের এই আহ্বানকে দেশবিরোধী বলে মনে করেন ?