হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ এখন এক বিশাল আর্থিক ও ভূ-রাজনৈতিক দরকষাকষিতে রূপ নিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাপী সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে ইরান।
বর্তমানে তেহরান এই প্রণালির ওপর তাদের পূর্ণ কর্তৃত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দাবি করছে, যা অর্জিত হলে দেশটির মাসিক আয় ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন।
সম্প্রতি ইরান যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ১০ দফার একটি নতুন এজেন্ডা পেশ করেছে। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের অধিকারের স্বীকৃতির পাশাপাশি পারমাণবিক কর্মসূচির বৈধতা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইসরাইলি হামলা বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে।
মূলত এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ চলাচল করে, যা থেকে ইরান প্রতিটি জাহাজ প্রতি গড়ে ১০ থেকে ১৫ লাখ ডলার ‘টোল’ আদায়ের পরিকল্পনা করছে। ইরানের অভ্যন্তরীণ সূত্রমতে, এই বিশাল অর্থ দিয়ে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং তাদের মিসাইল ও ড্রোন ভাণ্ডার পুনরায় সমৃদ্ধ করতে চায়।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধের আগে থেকে এখন পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৩৮ শতাংশ বেড়ে ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম গ্যালন প্রতি ৪ ডলার অতিক্রম করায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র চাপের মুখে রয়েছেন।
ভারত, চীন ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলো, যারা তাদের তেলের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে আমদানি করে, তারা দীর্ঘমেয়াদী মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কায় রয়েছে। বিশেষ করে ভারত তাদের চাহিদার প্রায় ৪০-৫০ শতাংশ তেল এই পথেই পায়। যদিও ভারত সরকার এখন পর্যন্ত কোনো টোল দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এই খরচ আমদানিকারকদের ওপর পড়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
আইনি দিক থেকে ইরানের এই দাবি বেশ বিতর্কিত। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন অনুযায়ী হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক জলপথ, যেখানে সব ধরনের জাহাজের অবাধ চলাচলের অধিকার রয়েছে। ওমান এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের এই একক কর্তৃত্বের দাবির বিরোধিতা করলেও তেহরান একে তাদের ‘এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন’ হিসেবে দাবি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি এই জলপথের ‘গেটকিপার’ বা দ্বাররক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবে তা কেবল অর্থনৈতিক জয় নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে তাদের এক অপরাজেয় কৌশলগত অবস্থান তৈরি করবে। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যতের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: এনডিটিভি।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?