ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। তবে তারা জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীদের দেয়া যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের জবাব তারা প্রস্তুত করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা চলতে থাকলে সরাসরি আলোচনায় অংশ নেবে না বলেও স্পষ্ট করেছে তেহরান। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্তত ছয়জন শিশু রয়েছে। বিভিন্ন শহরে অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দেন তিনি। এর জবাবে ইরান পাল্টা আক্রমণের সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরাইলের হাইফা শহরের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে অন্তত চারজন নিহত হন বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলেও ইরানি হামলা অব্যাহত রয়েছে। কুয়েতে বিদ্যুৎ ও পানিশোধন প্ল্যান্টে আঘাত হানার পাশাপাশি বাহরাইনের একটি তেল স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
যুদ্ধবিরতি নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও বাস্তবে সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা পুরো অঞ্চলে বড় ধরনের সংকটে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।সংবাদ বিশ্লেষণ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই বলেছেন, যুদ্ধবিরতি অনেক সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘পুনরায় সংগঠিত হয়ে নতুন হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ’ তৈরি করে।
সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে বাঘাই বলেন, অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতি প্রকৃত সমাধান নয়, বরং তা সাময়িক বিরতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তাই ইরান তাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমে কোনো ধরনের দ্বিধা দেখাবে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের জন্য জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের স্বার্থই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো চাপ বা আল্টিমেটামের মধ্যে থেকে আলোচনা করা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাঘাই দাবি করেন, অনেক ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শক্তিধর দেশগুলোর প্রভাবের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে ইরানকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। তাই আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়নি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের শীর্ষ নেতা খামেনেয়ীর হত্যাকা-ের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এর জবাবে ইরানও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের এ অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দ্রুত যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। বরং সামরিক উত্তেজনা আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের লক্ষ্যে ৪৫ দিনের একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর উপস্থিতিতে এ আলোচনা হয়েছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আংশিক কোনও চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ক্ষীণ হলেও, পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি ঠেকাতে এ প্রচেষ্টাটিই এখন একমাত্র সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ চেষ্টা ব্যর্থ হলে ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে ব্যাপক হামলা এবং পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি ও পানি শোধনাগারগুলোতে ভয়াবহ হামলার আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার দেওয়া সময়সীমা আরও ২০ ঘণ্টা বাড়িয়ে মঙ্গলবার পূর্বঞ্চলীয় সময় (ইএসটি) রাত ৮টা পর্যন্ত নতুন ডেডলাইন নির্ধারণ করেছেন। অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গভীর আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব। ভালো সুযোগ রয়েছে, তবে তারা যদি চুক্তিতে না আসে, তবে আমি ওখানের সবকিছু উড়িয়ে দেব।
জানা গেছে, পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতাকারীদের পাশাপাশি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মধ্যে সরাসরি বার্তার মাধ্যমে এ আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত দুই ধাপের চুক্তিতে প্রথমে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতি এবং পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ শেষ করার কথা বলা হয়েছে।
মধ্যস্থতাকারীরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়া এবং ইরানের উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সমস্যার সমাধান কেবল একটি চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমেই সম্ভব। তবে ইরানিরা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তারা গাজা বা লেবাননের মতো পরিস্থিতি চায় না, যেখানে যুদ্ধবিরতি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌ শাখা কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
তাদের ভাষ্যমতে, হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি যুদ্ধের আগের অবস্থায় ‘কখনোই ফিরবে না’। মধ্যস্থতাকারীরা ইরানি কর্মকর্তাদের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন, কৌশল দেখানোর আর সময় নেই। আগামী ৪৮ ঘণ্টাই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর শেষ সুযোগ।
ইরানের হামলায় পিছু হটলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি ) দাবি করেছে, তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট জাহাজ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। আইআরজিসি জানায়, ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস ৪’-এর ৯৮তম ধাপে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ও লজিস্টিক স্থাপনাগুলোতে সমন্বিত হামলা চালিয়েছে। এতে নৌ ও মহাকাশ বাহিনী যৌথভাবে অংশ নেয়।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস ত্রিপোলি (এলএইচএ-৭)-কে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। এতে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দক্ষিণ ভারত মহাসাগরের দিকে সরে যেতে বাধ্য হয়।
আইআরজিসি আরো দাবি করেছে, তেল আবিব, হাইফা ও বিয়ার শেভাসহ বিভিন্ন কৌশলগত স্থানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। তাদের মতে, এসব হামলা ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করতে পারেনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি যৌথ ড্রোন উৎপাদন কেন্দ্র এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিতে থাকা কিছু উড়োজাহাজকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
ইরানের সিরিজ হামলায় ইসরাইলি শহরগুলো : ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে হামলার পাল্টা জবাবে ইসরাইলজুড়ে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। আট দফায় চালানো এ হামলায় মধ্য ইসরাইল, হাইফা ও তেল আবিবসহ বেশ কিছু শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাইফায় ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে অন্তত দুইজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো। ইসরাইলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ সার্ভিস জানিয়েছে, হাইফা শহরে ইরানি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে একটি ভবন বিধ্বস্ত হয়। রেহাম ফ্রন্ট কমান্ডের সাথে যৌথভাবে কয়েক ঘণ্টার প্রচেষ্টার পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। সংস্থাটি আরো জানিয়েছে, ওই ভবনে আরো দুইজন নিখোঁজ রয়েছেন।
তাদের উদ্ধারে এখনো অভিযান অব্যাহত আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ক্লাস্টার বোমার আঘাতে একটি চলন্ত গাড়িতে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়। অন্য একটি বোমার প্রচ- বিস্ফোরণে রাস্তার পাশে থাকা একটি গাড়ি উল্টে গিয়ে দুমড়েমুচড়ে যায়।
রেতহরানের এ আকস্মিক হামলায় তেল আবিব অঞ্চলেও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ওইসব এলাকার ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরান জানিয়েছে, তাদের পরমাণু কেন্দ্রে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদেই এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা নতুন করে চরম আকার ধারণ করেছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সতর্ক করে বলেছেন, তার দেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক আগ্রাসন কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রাহ্মণ্যম জয়শঙ্করের সঙ্গে এক জরুরি ফোনালাপে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উদ্বেগজনক পরিস্থিতি এবং ইরানের ওপর পরিচালিত হামলার ভয়াবহ পরিণাম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
আরো বিধ্বংসী প্রতিশোধ নেয়ার হুঁশিয়ারি ইরানের : ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যদি বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা অব্যাহত রাখে তাহলে অনেক বেশি বিধ্বংসী প্রতিশোধ নেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং (আইআরআইবি) এনিয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে। দেশটির খাতাম আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের একজন মুখপাত্রের দেওয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পুনরাবৃত্তি হলে আমাদের আক্রমণাত্মক ও প্রতিশোধমূলক অভিযানের পরবর্তী পর্যায়গুলো আরও অনেক বেশি বিধ্বংসী ও ব্যাপক হবে।সংবাদ বিশ্লেষণ
আইআরজিসির গোয়েন্দা প্রধানকে হত্যা : ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান মেজর জেনারেল সৈয়দ মাজিদ খাদেমি নিহত হয়েছেন। সোমবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার লাইভ প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
এনিয়ে আইআরজিসির একটি বিবৃতি প্রকাশ করেছে ফার্স নিউজ এজেন্সি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গতকাল ভোর রাতে মার্কিন-জায়নবাদী শত্রুদের এক সন্ত্রাসী হামলায় খাদেমি নিহত হয়েছেন। তবে এনিয়ে বিস্তারিত আর কিছু আইআরজিসি’র বিবৃতিতে বলা হয়নি বলে জানিয়েছে।
সূত্র : আল-জাজিরা, তাসনিম নিউজ এজেন্সী, প্রেস টিভি, টিআরটি ওয়ার্ল্ড।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?