ইরান এবং আমেরিকার মধ্যে চলমান সংঘাত নিরসনে ওয়াশিংটনের দেওয়া ১৫ দফা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নিয়ে তেহরানে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বুধবার (২৫ মার্চ) হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইরানকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই প্রস্তাব গ্রহণ না করলে দেশটিকে আগের চেয়েও ভয়াবহ ‘কঠোর আঘাতের’ মুখোমুখি হতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন ‘প্রেস টিভি’-কে একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ কেবল তেহরানের নিজস্ব শর্ত এবং সময়সূচি অনুযায়ীই বন্ধ হবে। অন্যদিকে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অন্য একজন ইরানি কর্মকর্তা জানান, আমেরিকার প্রস্তাবের প্রতি তেহরানের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ইতিবাচক না হলেও তারা বিষয়টি এখনো গভীরভাবে পর্যালোচনা করছে। ইরান তাদের মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের মাধ্যমে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক জবাব ওয়াশিংটনের কাছে পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া ১৫ দফা পরিকল্পনায় মূলত ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
তবে ইরানের পক্ষ থেকে পাঁচটি প্রধান শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর ওপর তেহরানের ‘স্বাভাবিক ও আইনি অধিকার’ স্বীকার করে নেওয়া, ইরান ও তার মিত্র প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধ করা, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির গ্যারান্টিযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে পুনরায় হামলা হবে না এমন সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা।
এছাড়া ইরান পুরো অঞ্চল থেকে সব মার্কিন ঘাঁটি সরিয়ে নেওয়া এবং সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন যে, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান করা মানেই আমেরিকার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা নয়। তিনি স্পষ্ট করে দেন, তেহরানের বর্তমান নীতি হলো ‘প্রতিরোধ চালিয়ে যাওয়া’ এবং এই মুহূর্তে আলোচনার কথা বলা মানেই পরাজয় মেনে নেওয়া।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট দাবি করেছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা এখনো ফলপ্রসূ এবং তা অব্যাহত রয়েছে।
লেভিট জানান, ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার হুমকি আপাতত স্থগিত রেখেছেন কারণ তেহরান আলোচনার আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, ইরান যদি নিজেদের সামরিক পরাজয় বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের ওপর আরও কঠোর আঘাত হানা হবে।
এদিকে ইসরায়েল ভয় পাচ্ছে যে ট্রাম্প হয়তো হুট করে কোনো যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে পারেন, যার ফলে তাদের সামরিক অভিযান অপূর্ণ থেকে যাবে। এই আশঙ্কায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের ওপর হামলার তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
চ্যানেল ১২ নিউজের তথ্যমতে, আগামী শনিবারের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে এমন সম্ভাবনা মাথায় রেখে ইসরায়েল তাদের লক্ষ্যবস্তুগুলোর তালিকা নতুন করে সাজিয়েছে।
অন্যদিকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত সাইমন ওয়াল্টার্স জানিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ করতে যুক্তরাজ্য তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে একটি কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ বলে অভিহিত করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় প্রায় ৫ হাজার ইরানি সৈন্য নিহত এবং আরও হাজার হাজার আহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাল্টা হিসেবে ইরান ও তার সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো ইসরায়েল ছাড়াও বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, আমেরিকা যদি কোনো ভুল পদক্ষেপ নেয় তবে তারা বাহরাইন এবং আরব আমিরাতের উপকূলীয় এলাকা দখল করে নেবে।
এছাড়া লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নতুন ফ্রন্ট খোলার হুমকিও দিয়েছে তেহরান। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে একটি বৃহৎ পরিসরের যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?