মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত শুধু সামরিক লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং আদর্শিক লড়াইয়েও পরিণত হয়েছে।
এমন এক প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর উদ্দেশে খোলা চিঠি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার প্রধান। এই চিঠিকে অনেকেই আঞ্চলিক সমর্থন আদায়ের কৌশল হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে এক ধরনের রাজনৈতিক বার্তা বলেও মনে করছেন।রাজনৈতিক সংবাদ
এই খোলা চিঠিটি দিয়েছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান ও সচিব আলী লারিজানি। আরবি ভাষায় লেখা এই বার্তায় তিনি সরাসরি মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন—বর্তমান সংঘাতে যেন তারা ইরানের পাশে দাঁড়ায়। তার মতে, এই যুদ্ধ কেবল একটি দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং বৃহত্তর একটি শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক।
চিঠিতে আলী লারিজানি বর্তমান সংঘাতকে দুই পক্ষের লড়াই হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার ভাষায়, একদিকে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, আর অন্যদিকে রয়েছে ‘প্রতিরোধী শক্তি’। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র কখনওই কারও প্রতি বিশ্বস্ত নয় এবং ইসরায়েল মুসলিম বিশ্বের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি।
তিনি মুসলিম দেশগুলোর উদ্দেশে বলেন, “এক মুহূর্তের জন্য থামুন এবং এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবুন।” তার বক্তব্য অনুযায়ী, ইরান সবসময় মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চেয়েছে এবং কখনও তাদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার চেষ্টা করেনি।
লারিজানি তার চিঠিতে ইরানকে ‘মার্কিন-জায়নবাদী আগ্রাসনের’ শিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানকে দুর্বল ও ধ্বংস করার লক্ষ্যে এই যুদ্ধ শুরু করেছে। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ইরানের এমন সংকটময় সময়ে মুসলিম বিশ্বের দেশগুলো থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। অধিকাংশ দেশ সীমিত বা নীরব অবস্থান নিয়েছে, যা তেহরানের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিঠির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে লারিজানি স্পষ্ট করে জানান যে, ইরান সহজে এই সংঘাতে পিছু হটবে না। তিনি বলেন, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত ‘আগ্রাসী শক্তির জন্যই ক্ষতিকর হবে’। তার মতে, ইরানের জনগণ সাহসী এবং তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন দেশের অভ্যন্তরীণ মনোবল জোরদার করতে চেয়েছেন, অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি দৃঢ় বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
বর্তমান যুদ্ধের আগে কূটনৈতিক পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা ২১ দিন ধরে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলে। এই সংলাপের উদ্দেশ্য ছিল ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।
তবে দীর্ঘ আলোচনার পরও কোনো চুক্তি ছাড়াই আলোচনা শেষ হয়। এই ব্যর্থতাই পরবর্তী সামরিক সংঘাতের পথ আরও প্রশস্ত করে দেয় বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সংলাপ ভেঙে যাওয়ার ঠিক পরদিন, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। একই সময় ইসরায়েলও নিজেদের অভিযান শুরু করে, যার নাম ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’।
এই দুই অভিযানের মাধ্যমে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। এতে করে পরিস্থিতি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়।
এই হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। বিশেষ করে সউদী আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমানের ভেতরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর একাধিক দফায় হামলা চালানো হয়েছে।
এই হামলা এখনো অব্যাহত রয়েছে, যা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ তাদের ভূখণ্ডে ইরানি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলছে, এই ধরনের হামলা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে একদিকে যেমন ইরান মুসলিম বিশ্বের সমর্থন চাচ্ছে, অন্যদিকে অনেক দেশই নিজেদের নিরাপত্তার কারণে ইরানের কর্মকাণ্ড থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। এই দ্বৈত অবস্থান পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—এই সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে। ইরানের এই খোলা চিঠি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে তারা আঞ্চলিক সমর্থন জোগাড় করতে চাইছে। তবে বাস্তবতা হলো, মুসলিম বিশ্বের অনেক দেশই সরাসরি এই যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি দ্রুত কূটনৈতিক সমাধান না আসে, তাহলে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং তা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আলী লারিজানির এই খোলা চিঠি শুধু একটি আহ্বান নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংকট, বিভাজন এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যতের একটি প্রতিচ্ছবি, যেখানে যুদ্ধ ও কূটনীতির লড়াই একসঙ্গে চলতে থাকে। তথ্যসূত্র : সিএনএন
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?