রোকুনুজ্জামান, জবি প্রতিনিধি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আবাসন বৃত্তির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত প্রথম ও দ্বিতীয় তালিকা মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী এই বৃত্তির আওতায় এসেছেন। তবে এই তালিকায় এমন অনেক শিক্ষার্থী স্থান পেয়েছেন যারা ইতিমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে আবাসন সুবিধা ভোগ করছেন।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ নতুন শহরে আবাসন ও আর্থিক সংকটে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীনতম ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এই তালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে হলের শিক্ষার্থীরা আবাসন ও বৃত্তি উভয় সুবিধা পেলেও, ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা উভয় সুবিধা থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন। এই ‘দ্বিমুখী নীতি’ নিয়ে নবীন শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
২২ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কৃতক প্রকাশিত তালিকা বিশ্লেষণ করে জানা যায়, প্রথম তালিকায় ২০১৯–২০ থেকে ২০২৩–২৪ শিক্ষাবর্ষের মোট ৮,৩৩০ জন এবং দ্বিতীয় তালিকায় আরও ১,৯৮৯ জন শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
কিন্তু আবাসন সংকটে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ২০তম ব্যাচকে এখনই বৃত্তির আওতায় আনা হচ্ছে না; তাদের বিষয়টি বৃত্তির দ্বিতীয় কিস্তিতে বিবেচনা করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে ‘সম্পূর্ণ অবিচার’ বলে দাবি করে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের অর্থাৎ ২০তম আবর্তনের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী শফিক খান হাসিব ব্যাচের শিক্ষার্থী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা নতুন একটি শহরে এসেছি।
এখানে থাকার জায়গা নেই, টিউশন সংকট প্রকট, এর ওপর মেস ভাড়ার বোঝা। অথচ প্রশাসন আমাদের বাদ দিয়ে এমন অনেককে বৃত্তি দিচ্ছে যারা ইতিমধ্যেই হলে থাকছে। কাউকে আবাসন ও আবাসন বৃত্তি দুটোই দেওয়া হচ্ছে, আবার কাউকে দুটোর একটিও দেওয়া হচ্ছে না এটা কোন ধরনের ন্যায্যতা? যদি সবাইকে দিতো, তাহলে হলের শিক্ষার্থীরা পেলেও আমাদের সমস্যা ছিলো না।”
মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বলেন, “আস-সুন্নাহ হলে যারা থাকেন, তাদের বিষয়টি ভিন্ন। সেখানে পরিবেশ ও সিটের স্থায়িত্ব নিয়ে সমস্যা থাকায় তাদের বৃত্তি পাওয়া যৌক্তিক হতে পারে।
একইভাবে মেয়েদের হলের খুব অস্বচ্ছলদের বিষয়টিও বিবেচনা করা যায়। কিন্তু ঢালাওভাবে হলের সিটপ্রাপ্তদের বৃত্তি দিয়ে পুরো ২০ ব্যাচকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
আন্দোলনে অংশ না নেওয়ার অযুহাতে ২০ ব্যাচকে বাদ দেওয়ার মানসিকতার কড়া সমালোচনা করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা বলেন, “অনেকে বলছেন ২০ ব্যাচ বৃত্তির আন্দোলন করেনি, তাই তাদের বাদ দেওয়া যৌক্তিক।
তাদের বলতে চাই, মুক্তিযুদ্ধ বা হল আন্দোলন আমাদের পূর্বপুরুষ বা সিনিয়ররা করেছেন। তার সুফল কি আমরা ভোগ করছি না? প্রকৃত অধিকার আদায়ে যারা লড়েন, তারা সবার জন্যই লড়েন।
তাছাড়া তখন তো আমরা ক্যাম্পাসে ভর্তিই হইনি, তাই আন্দোলনে থাকার প্রশ্নই আসে না। এই খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে কাউকে ‘ডাবল বেনিফিট’ দেওয়া আর নবীনদের রাস্তায় রাখা প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।”
শিক্ষার্থীদের দাবি, অনতিবিলম্বে আবাসন বৃত্তির নীতিমালায় সংস্কার এনে ২০তম ব্যাচকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিশেষ করে যারা হলে সিট পাননি এবং অনাবাসিক হিসেবে চরম কষ্টে দিন পার করছেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই বৃত্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, নবীন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃষ্ট এই অসন্তোষ বড় ধরনের আন্দোলনে রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জকসুর এজিএস মাসুদ রানার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টিকে ‘সাংঘর্ষিক’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “বিষয়টি অবশ্যই সাংঘর্ষিক। আমরা চাই আবাসন বৃত্তি তারাই পাবে যারা আবাসন সুবিধায় বা হলে থাকেন না, মেসে থাকেন।
আমি বর্তমানে বাড়িতে থাকায় অফিশিয়ালি এখনো বিস্তারিত দেখিনি। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে তালিকা সংশোধন করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাব।”
এ বিষয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ট্রেজারার, জকসুর ভিপি এবং সমাজসেবা ও শিক্ষার্থীকল্যাণ সম্পাদকের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রাসঙ্গত, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লং মার্চ টু যমুনা আন্দোলনের ফলে সরকার আবাসন বৃত্তি চালুর উদ্যোগ নেয়। তবে বণ্টন প্রক্রিয়ায় হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং প্রকৃত সংকটগ্রস্ত নবীনদের বাদ দেওয়ায় এই মহৎ উদ্যোগটি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।