প্রতিদিনই পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একেকটি স্বপ্ন থেমে যাচ্ছে, ভেঙে পড়ছে পরিবার, হারিয়ে যাচ্ছে প্রিয় মানুষ—কারণ আত্মহত্যা। এই নীরব মহামারীর বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তুলতেই আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস।
বাংলাদেশেও কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, সহমর্মিতা ও সময়মতো সহায়তাই পারে অনেক জীবন বাঁচাতে।
এই দিবস উপলক্ষে মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ বিষয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া আহমেদের মতামত তুলে ধরেছেন শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মী সানজিদা খানম ঊর্মি।
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫– বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’। এ দিবসের মূল লক্ষ্য হলো আত্মহত্যা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা শুরু করা এবং সংকটে থাকা মানুষদের পাশে দাঁড়ানো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুবরণ করেন। গড়ে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও একজন মানুষ নিজের জীবন নিজেই শেষ করে দেন। এ সংখ্যা শুধুই পরিসংখ্যান নয়—প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি ভাঙা পরিবার, অসহায় আত্মীয়স্বজন, বন্ধুরা এবং স্তব্ধ হয়ে যাওয়া স্বপ্ন। আত্মহত্যাকে তাই বিশেষজ্ঞরা “নীরব মহামারী” বলে উল্লেখ করেন।
আত্মহত্যার কারণ নানা ধরনের। মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগ সবচেয়ে বড় কারণ হলেও এর সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক রোগ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্ক ভাঙন, অর্থনৈতিক চাপ, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য, মাদকাসক্তি এবং সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়া অনলাইন নিপীড়নও বড় ভূমিকা রাখছে।
বিশেষত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডিজিটাল একাকীত্ব বা সোশ্যাল মিডিয়ার নেতিবাচক প্রভাব আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তবুও সমাজে এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব রয়েছে। আত্মহত্যাকে এখনো অনেকে ‘পাপ’ বা ‘লজ্জাজনক’ বলে মনে করেন, অথচ এটি মূলত একটি মানসিক স্বাস্থ্য সংকট।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক পদক্ষেপ নিলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। সমস্যার কথা বলার ও শোনার পরিবেশ তৈরি করা, কষ্টে থাকা মানুষকে বিচার না করে সহমর্মিতার সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো, কাউন্সেলর বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়া এবং আত্মহত্যা বিষয়ে সামাজিক ট্যাবু ভেঙে সচেতনতা গড়ে তোলা খুবই জরুরি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, আত্মহত্যার প্রবণতা বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে বেশি। শিক্ষাগত ব্যর্থতা, পারিবারিক কলহ, প্রেমঘটিত জটিলতা, সামাজিক চাপ ও লজ্জা অনেককে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে বড় একটি অংশ নারী, বিশেষত গ্রামীণ অঞ্চলের তরুণী। কিন্তু দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এখনো সীমিত। সরকারি হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা অপ্রতুল, আর গ্রামীণ এলাকায় এ সেবা প্রায় অনুপস্থিত।
তবে কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে। হেল্পলাইন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, অনলাইন সাপোর্ট গ্রুপ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সেমিনার ও কর্মশালা আয়োজন শুরু হয়েছে। কিন্তু তা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
আমাদের করণীয় হলো—সংকটে থাকা কাউকে একা না রাখা, আত্মহত্যার ইঙ্গিত বা চিন্তাকে অবহেলা না করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও নিয়মিত কাউন্সেলিং চালু করা এবং গণমাধ্যমে আত্মহত্যা সম্পর্কিত খবর পরিবেশনের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা।
আত্মহত্যা কোনো সমাধান নয়। এটি সাময়িক সমস্যার জন্য একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজার ভুল প্রচেষ্টা। সহমর্মিতা, ভালোবাসা এবং সময়মতো সহায়তার মাধ্যমে বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
তাই আজকের এই বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসে আমাদের সবার প্রতিজ্ঞা হোক—মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করব, সংকটে থাকা মানুষকে সাহায্য করব, আর কোনো মানুষকে একাকীত্বের অন্ধকারে ফেলে রাখব না।