আবু তাহের, জাককানইবি
একুশ মানে মুক্তি, একুশ মানে চেতনা। একুশ মানে বাংলাকে নিয়ে কোনো সমঝোতা না করে লড়াই করা। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালির গর্বের দিন। সালাম, রফিক, শফিক, বরকত ও জব্বারের মতো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে বাংলা পেয়েছিল রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি।
তরুণ প্রজন্মের কাছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি কী অর্থ বহন করে? একুশ নিয়ে তাদের ভাবনা কী? তারুণ্যের ভাবনার বিস্তারিত তুলে ধরেছেন দৈনিক সকালে’র প্রতিনিধি আবু তাহের।
শিক্ষার্থী সেবিকা তালুকদার বলেন, ‘অমর একুশ কেবল একটি তারিখ নয়; এটি ভাষার অধিকার, আত্মপরিচয় এবং মুক্ত চিন্তার জন্য আত্মত্যাগের চেতনার প্রতীক।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের শক্তি যতই প্রবল হোক, মানুষের আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা তার চেয়ে শক্তিশালী। মাতৃভাষায় কথা বলা, লেখা ও ভাবা কেবল অভ্যাস নয়,
এটি অর্জিত অধিকার, যা শহীদদের ত্যাগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অমর একুশ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা মানে চিন্তার স্বাধীনতা রক্ষা করা, ন্যায় ও সঠিকের পক্ষে দাঁড়ানো মানে প্রকৃত নাগরিকত্বের প্রকাশ।
তাই একুশ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষাকে ভালোবাসা, শুদ্ধভাবে চর্চা করা, বৈচিত্র্যকে সম্মান করা এবং এই চেতনাকে আগামীর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত রাখা আমাদের অন্যতম’
শিক্ষার্থী নাইম বলেন, ‘২১শে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতীয় জীবনের এক গভীর অনুভূতির দিন। এই দিনটি শুধু একটি তারিখ নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের প্রতীক। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার জন্য যে তরুণরা জীবন দিয়েছিলেন,
তাদের ত্যাগ আমাদের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর প্রাঙ্গণে ভাষার দাবিতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তা ছিল ন্যায় ও আত্মমর্যাদার সংগ্রাম। শহীদ সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বার-এর আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি,
চিন্তা ও অস্তিত্বের ভিত্তি। আজ ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবেও স্বীকৃত, যা ঘোষণা করেছে UNESCO। এর মাধ্যমে সারা বিশ্বে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। আমার মনে হয়, ভাষা দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য তখনই পূর্ণ হবে,
যখন আমরা নিজের ভাষাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করব, শুদ্ধভাবে লিখব ও বলব, এবং অন্যের মাতৃভাষাকেও সম্মান করব। বাংলা ভাষা আমাদের গর্ব, আমাদের পরিচয়। তাই ভাষার মর্যাদা রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি—আমরা যেন বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি, লালন করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে গর্বের সঙ্গে তুলে ধরি।’
ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমার কাছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, এটা আমাদের হৃদয়ের গভীরে গাঁথা এক অমলিন অনুভূতি।
এই দিনের ভেতরে আছে ভাষার জন্য ভালোবাসা, আত্মত্যাগ আর অদম্য সাহসের গল্প। নিজের মাতৃভাষাকে নিজের অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে বাঙালিকে রাজপথে নামতে হয়েছে,
বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়েছে বুলেটের সামনে। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা। আজ আমরা যে ভাষায় স্বপ্ন দেখি, হাসি-কাঁদি,
মনের সব কথা প্রকাশ করি,সেই ভাষা আমাদের কাছে এসেছে শহিদদের ত্যাগের পথ ধরে। তাই একুশ মানে শুধু স্মৃতি নয়, একুশ মানে আত্মপরিচয়ের অহংকার, একুশ মানে বাঙালির চিরন্তন চেতনা।’
হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী সারায়াত জামান বলেন, ‘অমর একুশ কেবল অতীতের কোনো স্মৃতি নয়; এটি ভাষা, পরিচয় ও আত্মসম্মানের প্রতীক। একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর দৃষ্টিতে একুশ মানে নিজের ভাষার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার প্রেরণা।
১৯৫২ সালের আত্মত্যাগ আমাদের বাংলায় কথা বলার স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। সেই ত্যাগের প্রকৃত সম্মান তখনই রক্ষা হবে, যখন আমরা আনুষ্ঠানিক স্মরণের বাইরে গিয়ে প্রতিদিনের জীবন, চিন্তা ও আচরণে ভাষার মর্যাদা বজায় রাখবো।’
শিক্ষার্থী তাসকেরাতুন নূর বর্না বলেন, ‘বাঙালি জাতি বীরের জাতি, যার অন্যতম সৃষ্টি মহান একুশ। একুশ—একটি চেতনা, একটি বৈশ্বিক প্রতীক এবং ভাষাগত অধিকার প্রতিষ্ঠার মহাবিস্ফোরণ।
১৯৪৭-পরবর্তী পাকিস্তানি রাষ্ট্রকাঠামো উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষার অধিকার অস্বীকার করে। এর প্রতিবাদে ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সংগঠিত আন্দোলন,
যা ১৯৫২ সালে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানো হলে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিতে গড়ে ওঠে শহীদ মিনার এবং প্রতিবছর পালন করা হয় শহীদ দিবস। একুশে ফেব্রুয়ারির আত্মত্যাগ বাঙালিকে তার ন্যায্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছে এবং পরবর্তী সকল আন্দোলনের প্রেরণা জুগিয়েছে। এই একুশের চেতনা আজও বাঙালি জাতির মনে অবিনাশী শক্তি হয়ে গ্রথিত আছে।’
নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী শাহরিয়ার জামান লেলিন বলেন, ‘২১ সংখ্যাটা তেমন বড় না হলেও আমার কাছে এই সংখ্যার ভার অনেক বেশি। কারণ এই একুশ ছিল বলেই হয়তো আজ আমি, আমরা—নিজেদের জানতে,
চিনতে এবং নিজেদের মতো করে আবিষ্কার করতে পারছি। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যে বিষয়টির উন্মেষ ঘটেছিল,
তা হলো বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা এবং নিজের জাতিসত্তার প্রতি দায়বদ্ধতা। পরবর্তীতে সেটিই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হিসেবে অঙ্কুরিত হয়েছে। আমি যেহেতু নৃবিজ্ঞানের ছাত্র,
তাই আমার জায়গা থেকে বললে বলতে হয়—ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা আমাদের বাস্তবতা ও চিন্তার জগত বিনির্মাণের অন্যতম হাতিয়ার (স্যাপির–উরফ তত্ত্ব অনুযায়ী)।
আরেকটু বৈজ্ঞানিকভাবে বললে, ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের মস্তিষ্কে নিউরনের গঠনচিত্রও ভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। যদি ২১ না থাকত, তবে আমরা আমাদের চিন্তা ও ভাবনার স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতাম।
২১ ছিল বলেই আমরা নিজেদের জানতে, চিনতে এবং নিজেদের পরিবেশ-প্রতিবেশকে নিজের মতো করে জানতে পারছি। একুশ ছিল বলেই এত সহজ ও সাবলীল চিন্তার খেলায় মেতে উঠতে পারি আমরা—
জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, জসিমউদ্দীনের নকশীকাঁথা কিংবা নজরুলের বিদ্রোহী সত্তাকে ধারণ করতে পারি নিজের মধ্যে। আমাদের জীবনবোধের যে অনন্যতা ও স্বকীয়তা, সেটাও কিন্তু একুশেরই অবদান। যেমনটা আগেই বলেছি, ২১ শুধু ভাষার স্বাধীনতার স্বাদই দেয়নি;
২১ আমাদের ভেতরের স্বাধীনচেতা সত্তাকে জাতীয়তাবাদের রূপে জাগ্রত করেছে, আমাদের প্রস্তুত করেছে নিজেদের অধিকার ও স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ের জন্য। আর তাই তো—একুশ আমার অস্তিত্ব, একুশ আমার শেকড়।’