ফয়সাল আহমাদ ,শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি
গোটা জীবনের অশ্রু-হাহাকার যেন সঞ্চিত হয়ে আছে ৬৫ বছরের এই নারী, তাসলিমা খাতুনের চোখে। এক সময় স্বামী-সন্তান নিয়ে যিনি নিরবে সংসার সামলাতেন, ভাগ্যের নির্মম আঘাতে সেই মানুষটি আজ দুঃখ-বেদনার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
স্বামীহীন জীবনে দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করেই দিন কাটছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া ছোট্ট একটি দুর্ঘটনা তার জীবনটাকে মুহূর্তেই পাল্টে দেয়। বড়োই গাছের নিচে কাজ করার সময় পায়ে বিঁধে যাওয়া একটি কাটা ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর ইনফেকশনে পরিণত হয়।
চিকিৎসার খরচ সামলাতে হিমশিম খাওয়া পরিবার শেষে জানতে পারে—তাসলিমার ডান পা আর বাঁচানোর উপায় নেই।
জীবন বাঁচলেও পা হারানোর সেই দুঃসহ মুহূর্ত থেকে তার পৃথিবী যেন থমকে যায়। ধীরে ধীরে ডান হাতসহ শরীরের অন্যান্য অংশও অবশ হয়ে পড়ে। ছয় মাস ধরে ঘরবন্দি হয়ে একটি একাকী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। নড়াচড়ার সামর্থ্য না থাকায় প্রতিটি মুহূর্তে অন্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছিল।
একটি হুইলচেয়ার তার জীবনে ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়—কিন্তু দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় তার শেষ সম্বলটুকুও শেষ করে দিয়েছে। অসহায়তা যেন পায়ের ব্যথার চেয়েও বড়ো যন্ত্রণা হয়ে উঠেছিল।
ঠিক এই কঠিন সময়ে তার জীবনে আলো হয়ে আসেন গাজীপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ভূইয়া। তাসলিমার দুর্বিষহ অবস্থার কথা জেনে তিনি ব্যক্তিগত মানবিক উদ্যোগে একটি হুইলচেয়ার কিনে মঙ্গলবার (৯ ডিসেম্বর) বিকেলে পৌঁছে দেন তার বাড়িতে।
হুইলচেয়ার পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তাসলিমা। কাঁপা কণ্ঠে বলেন,
“স্বামীহারা হয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কিন্তু পা হারানোর পর মনে হয়েছিল আমার জীবন শেষ। আজ মনে হচ্ছে—আল্লাহ আবার আমাকে চলার শক্তি দিয়ে দিলেন। এই হুইলচেয়ার শুধু আমার বসার চাকা নয়—এটা আমার বেঁচে থাকার নতুন ভরসা।”
হুইলচেয়ার হস্তান্তরে শফিকুল ইসলাম ভূইয়া বলেন,
“অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতাও। গাজীপুর জেলা প্রেসক্লাবসহ শ্রীপুরের সাংবাদিক সমাজ এই মায়ের পাশে দাঁড়াতে পেরে গর্বিত।”
এ সময় উপস্থিত ছিলেন—মোঃ নাসির উদ্দীন মাস্টার, বাবুল সরকার, সাংবাদিক মুনসুরুল ইসলাম মাসুমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। উপস্থিত সবার চোখেই ছিল আবেগ ও মানবিকতার উজ্জ্বল ছাপ।
হুইলচেয়ারে বসে যখন তাসলিমা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে গেলেন—তার মুখে ফুটে ওঠা হাসিটি যেন ছয় মাসের গৃহবন্দি জীবনের সব অন্ধকার ছাপিয়ে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল—তিনি আবার আলো দেখছেন, আবার নতুনভাবে বাঁচার পথ খুঁজে পাচ্ছেন।