সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তানের বিভক্তির সময় থেকেই ছিটমহল সমস্যার সৃষ্টি হয়, কারণ সীমান্ত সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। এর ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ছিটমহল এবং ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল সৃষ্টি হয়েছিল।
২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, এসব ছিটমহলে বসবাসকারী মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫১ হাজার। এর মধ্যে বাংলাদেশের ভেতরের ভারতীয় ছিটমহলগুলিতে ৩৭ হাজার এবং ভারতের ভেতরের বাংলাদেশী ছিটমহলগুলিতে ১৪ হাজার মানুষ বসবাস করতেন, যারা নাগরিকত্ব ও মৌলিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর, ১৯৭৪ সালের মে মাসে শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে, ২০১৫ সালের পয়লা আগস্ট রাত ১২টা ১ মিনিটে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি কার্যকর হয়। এই চুক্তির ফলে দুই দেশের ছিটমহলগুলি পরস্পরের সঙ্গে বিনিময় করা হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রায় ১০ হাজার ৪৮ একর জমি বৃদ্ধি পায়।
বিনিময়ের পর বাংলাদেশ লালমনিরহাট, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারীর মোট ১১১টি ছিটমহল পায়, আর ভারত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থিত বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল (কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলায়) পায়। এই ঐতিহাসিক বিনিময়ের মাধ্যমে ছিটমহলবাসীরা অবশেষে তাদের নাগরিকত্ব এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার ফিরে পায় তা মূলত কাগজে-কলমে বাস্তব জীবনে তেমন কোন পরিবর্তন ঘটে নাই।
ছিটমহল বিনিময়ের আগে এই অঞ্চলের বাসিন্দারা নাগরিকত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য মৌলিক সুবিধা থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়ে এক দুর্বিষহ জীবনযাপন করতেন। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক বিনিময়ের পর তারা অবশেষে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তাদের মৌলিক অধিকার ও সুবিধাগুলি ফিরে পান।
বিনিময়ের পর বাংলাদেশ সরকার ছিটমহলবাসীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে মনোনিবেশ করে। সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো (যেমন বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, রাস্তা নির্মাণ) এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করে। তবে, এতকিছুর পরেও এই অঞ্চলের জীবনযাত্রার মান এখনো শহর এলাকার তুলনায় আকাঙ্ক্ষা এবং চাহিদার অনেক নিচে রয়েছে, যা বৃহত্তর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে।
তমাল রায় (৩৫) একজন হাতীবান্ধা উপজেলার সিংগীমারি ইউনিয়নের পকেটের বাসিন্দা তিনি বলেন, “ছিট মহল সমস্যার সমাধান হলেও এখনো আমাদের এখানে বিদ্যুৎ, পরিবহন এবং মোবাইলের নেটওয়ার্ক সংক্রান্ত যে জটিলতা গুলো আছে তা এখনো আমাদের জীবনকে সীমিত করে রেখেছে।
তাছাড়াও এই সীমান্তবর্তী জায়গায় আমাদের বসবাস হওয়ায় জীবনযাত্রার মানের কোন উন্নয়ন হয়নি শহরের সঙ্গে তুলনায়। আর সব সময় আমাদেরকে একটা ভয় ভীতির মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়।”
নিপা রানী (৫৫) একজন প্রাইমারি শিক্ষিকা। তিনি হাতীবান্ধা উপজেলার মধ্য বাড়াই পাড়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি বলেন, “আমাদের বেশিরভাগ বংশধর ভারতীয় আর আমাদের বসবাস এ পারে হাওয়ায় আমরা সব সময় একটা উৎকণ্ঠের মধ্যে জীবন যাপন করি। কখন যে কি হয় কারণ এই দিক দিয়ে যে পরিমাণ মাদক এবং অন্যান্য ভারতীয় পণ্যের যাতায়াত হয় তার ফলে প্রশাসনের সবসময় নজরদারির মধ্যে জীবন যাপন করতে হয়।”
ছিটমহল বিনিময়ের ফলে নাগরিকত্ব এলেও, বিশ্ব মানবাধিকার দিবসেও সেখানকার জীবন সীমিত। বিদ্যুৎ, পরিবহন ও নেটওয়ার্কের জটিলতা উন্নত জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এছাড়া, সীমান্ত নজরদারির কারণে ভয়-ভীতি ও উৎকণ্ঠা এখনো বিরাজমান। এই ঐতিহাসিক অর্জনের পূর্ণতা আনতে, অবকাঠামো ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জের দ্রুত সমাধান করে মানবাধিকার নিশ্চিত করা অপরিহার্য।