সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট
নদীমাতৃক বাংলাদেশে জীবনযাত্রার এমন করুণ চিত্র বিরল নয়। কিন্তু লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তিস্তা চর এলাকার এই দৃশ্য যেন আরও বেশি বেদনাদায়ক। মধ্যরাতে গুরুতর অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই ছেলেকে ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষায় থাকতে হয়, এরপর দীর্ঘ পথ পেরোতে হয় কাঁধে করে।
তিস্তা চর এলাকার মানুষের জীবনে এটি এক নিত্যদিনের লড়াই। বর্ষাকালে নদীপথ পেরোতে ভরসা কেবল নৌকা, আর শুকনো মৌসুমে ধু-ধু বালির উপর দিয়ে হাঁটা—এই হলো তাদের নিয়তি। স্থানীয়দের কথায়, “বর্ষায় নাও, শুকনায় পাও” এভাবেই চলছে জীবনযাত্রা। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো এক দুঃসাধ্য কাজ।
অসুস্থ মাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অন্য কোনো উপায় ছিল না ছেলেদের সামনে। কাঁধে করে মাকে নিয়ে হাসপাতাল পানে তাদের ছুটে চলার এই দৃশ্য তিস্তা চরের করুণ চিত্রকে ফুটিয়ে তুলেছে। সময়মতো উন্নত চিকিৎসা না পাওয়ায় বহু মানুষ পথেই প্রাণ হারায়। স্থানীয়রা জানান, জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে খাট বা বাঁশের খাটিয়ায় দড়ি দিয়ে বেঁধে চারজন মিলে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া এখানকার সাধারণ ঘটনা।
প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কারণে তিস্তা এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হলেও, শুকনো ও বর্ষা দুই মৌসুমেই এটি যেন অভিশাপের রূপ নেয়। বর্ষায় ঘর-বাড়ি হারানো, আর শুষ্ক মৌসুমে বালুচরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ায় জরুরি স্বাস্থ্যসেবার চরম দুর্ভোগ।
এখানকার সিংহভাগ মানুষ বংশ পরম্পরায় এই চরে বসবাস করেন। স্থানীয় একজন বাসিন্দা তমাল কান্তি আক্ষেপ করে বলেন, “যাওয়ার জায়গা না থাকলে এখানে পড়ে আছি। তিস্তা যেন মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া তিস্তাকে ঘিরে আমাদের জীবনের কর্মকাণ্ড, তাই এখানেই পড়ে আছি।”
নদী গবেষণা ইনস্টিটিউট (আরআরআই) মতে, তিস্তা নদীতে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে নদী খনন বাধ্যতামূলক হয়ে উঠেছে। যদি ‘তিস্তা প্রজেক্ট’ বাস্তবায়িত হয়, তবে তিস্তাবাসীর জীবন ও জীবিকার সমস্যার আংশিক হলেও সমাধান হতে পারে। এই চরের মানুষগুলোই ওপারে শহরের মানুষের জন্য মৎস্য এবং কৃষিজ শস্য উৎপাদনের জন্য নিজের পরিবার ও জীবন বিলিয়ে দিচ্ছে, অথচ সরকারে পক্ষ থেকে শিক্ষা বা চিকিৎসা খাতে তেমন কোনো সহযোগিতা দেখা যায় না—এখানকার মানুষকে যেতে হয় ওপারে শহরে।