সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
চলতি আমন মৌসুমে লালমনিরহাট জেলায় কৃষকদের মাঝে ভয়াবহ সার সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের মূল্য সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হারে গ্রহণ করছে সার ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা। এতে করে চাষাবাদে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশে সারের সরকারি দাম ও বাজারদরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। টিএসপি (সরকারি ১,৩৫০ টাকা) বাজারে ১,৬০০-২,৫০০ টাকা, ডিএপি (১,০৫০ টাকা) বাজারে ১,৩৫০-২,০০০ টাকা, ইউরিয়া (১,৩৫০ টাকা) বাজারে ১,৩৫০-১,৫০০ টাকা এবং এমওপি (১,০০০ টাকা) বাজারে ১,১০০-১,২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
লালমনিরহাটের কৃষকরা জানান, জেলাটি কৃষি প্রধান হওয়ায় তারা ধান, পাট, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলে নির্ভরশীল। কিন্তু প্রতি বছর সারের দাম বাড়ায় তারা বড় সংকটে পড়ছেন। কৃষক সন্তোষ কুমার রায় বলেন, এভাবে দাম বাড়লে কৃষকদের বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে।
আরেক কৃষক মোহাম্মদ হাফিজুর রহমান জানান, সরকারি নির্ধারিত ১,৩৫০ টাকার টিএসপি সার বাজারে ১,৬০০-১,৭০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
অভিযোগ আছে, লালমনিরহাটের কিছু অসাধু ডিলার ইচ্ছাকৃতভাবে টিএসপি সার মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে এবং পরে তা তামাক কোম্পানি ও চাষীদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান, তারা ডিলারদের কাছ থেকে সরকারের নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন; যেমন টিএসপি সার ১,৩৫০ টাকার বদলে ১,৫০০-১,৬০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে জেলার জন্য ইউরিয়া ৬৮,৯৩২ মেট্রিক টন, টিএসপি ৩০,২১০ মেট্রিক টন, ডিএপি ৪৫,৩২০ মেট্রিক টন, এমওপি ৪৯,৬১৬ মেট্রিক টন সারের চাহিদা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। সরকার এ পর্যন্ত লালমনিরহাট জেলার জন্য ইউরিয়া ৩৯,৬৯০ টন, টিএসপি ১২,৭০২ টন, এমওপি ১৫,৮৫৩ টন, ডিএপি ২৩,৫১১ টন সার বরাদ্দ দিয়েছে ।
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মো. সাইখুল আরেফিন জানান, জেলায় সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে, কোনো অভাব বা দাম বাড়ার অভিযোগ তাদের কাছে নেই। তিনি বলেন, কেউ যদি অভিযোগ করে তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অসাধুদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।
লালমনিরহাট ছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় একই ধরনের সার সংকটের প্রতিবেদন পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলায় সারের সংকট রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, সার সংকট চলতে থাকলে আমন ধানের উৎপাদন কমে যেতে পারে, যা দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলবে। অধ্যাপক এএইচএম সাইফুল ইসলাম বলেন, ধান চাষে সার অপরিহার্য এবং আমন মৌসুমে এর সংকট উৎপাদনে বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
লালমনিরহাটে কৃষকরা সরকারি দামে সার না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন। অসাধু ডিলারদের কৃত্রিম সংকটে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এ অবস্থায় কঠোর নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালতের ব্যবস্থা ও সার বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কৃষকরা ন্যায্য দামে সার পান এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়।