নূরুল আলম কামাল, নেত্রকোনা :
প্রায় সময় হাওরাঞ্চলে অগ্নিকান্ড, নৌ ও সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে বিভিন্ন সময় মানুষের মৃত্যুও হয়। মাঝে মধ্যে নৌকা ডুবিতে আবার নিখোঁজও হয় মানুষ। নিখোঁজদের উদ্ধার করতে ময়মনসিংহ থেকে ডুবুরি দল আসে। হাওরবাসী এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকার নেত্রকোনার হাওর অঞ্চল খালিয়াজুরীতে ২০২৩ সালে নির্মাণ করে ফায়ার স্টেশন অফিস ভবন।
মূল সড়ক থেকে স্টেশনে প্রবেশের জন্য ২শ মিটার রাস্তা পাকা না থাকায় চালু হচ্ছে না স্টেশনটি। এ কারণে দমকল বাহিনীর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাওর পাড়ের মানুষ। তবে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত বিভাগ বলছেন, ভবন প্রস্তুত করে বারবার চিঠি দেওয়ার পরও ভবনটি বুঝে নিচ্ছেন না ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।
এতে ভবনের বিভিন্ন মালামাল চুরি ও ভেঙে ফেলার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ঠিকাদার। স্থানীয়রা বলছেন ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় সেখানে মাদকসহ বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ সংগঠিত হয়। স্টেশনটি চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
জেলা বিভিন্ন দুর্ঘটনার তথ্য থেকে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলার মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজু হাওরজুড়ে যেন কান্নার শেষ নেই। ২০২০ সালের ৫ আগষ্ট মদন উপজেলার গোবিন্দশ্রী রাজালীকান্দা হাওরে ৪৮জন পর্যটক নিয়ে নৌকা ডুবে। স্থানীয়রা ৩০জনকে উদ্ধার করে।
কিন্তু এতে ১৮ জন মারা যায়। এর কয়েকদিন পর ১০সেপ্টেম্বর দুপুর বেলায় কলমাকান্দা হাওরে গোমাই নদীতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ডুবিতে ১২ জন মারা যান। সেদিন নিখোঁজ ১০জনকে স্থানীয়রা নানাভাবে উদ্ধার করেন। সেখানেও দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রাই উদ্ধার তৎপরতা চালান। হাওরপাড়ের মানুষেরা বলছেন, দুর্ঘটনা যত বড় বা ছোটই হয় সব গুলোতেই তাৎক্ষণিক স্থানীয়রাই যতটুকু সম্ভব সামাল দিতে পারেন। সেটাই হাওরবাসীর ভরসা।
নেত্রকোনা গণপূর্ত প্রকৌশল কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার হাওর অঞ্চল খাইয়াজুরি উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন অনুমোদন হয়। এরপর জায়গা অধিগ্রহণ করার পর ২০১৯ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর ৩ কোটি ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে অফিস ভবন নির্মাণের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন।
পরে এটির কাজ পায় নেত্রকোনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এস এ এন্টারপ্রাইজ। কার্যাদেশ পেয়ে ঠিকাদার নির্মাণের কার্যক্রম শুরু করে ৩১ এপ্রিল ২০২০ সালে। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালে এপ্রিল মাসে। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় দুইবার মেয়াদ বাড়ানো হয়। সেই সাথে নির্মাণ কাজের ব্যয় ৪৩ লাখ টাকা বেড়ে ৩ কোটি ৪৯ লাখ টাকা দাঁড়ায়।
নেত্রকোনা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনা জেলার হাওর ১২টি নৌ দুর্ঘটনা, ৩১১ টি অগ্নিকান্ড, ৮টি সড়ক ও ২৯টি অন্যান্য দুর্ঘটনাসহ মোট ৩৬০টি দুর্যোগের ঘটনা ঘটে। এতে ৫৪ জন মৃত্যু বরণ করেন। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ২৩ লাখ ৭২ হাজার টাকার।
হাওর উপজেলা খালিয়াজুরী সদরে তিন বছর আগে তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যায়ে নির্মাণ করা হয় ফায়ার স্টেশন। নেত্রকোনা-খালিয়াজুরী সড়ক থেকে স্টেশনে প্রবেশ করতে ২ মিটার রাস্তা রয়েছে। রাস্তাটি কাচা হওয়ায় স্টেশনটি চালু হচ্ছে না।
নূরপুর বোয়ালী গ্রামের মো: হাবিবুল্লাহ বলেন, ২শ মিটার সংযোগ সড়ক পাকা না থাকায় ফায়ার স্টেশন চালু হচ্ছে না। স্টেশনটির জনবল আছে। তারা অন্যত্র ডেপুটেশনে পোস্টিং নিয়ে আছে। এলাকায় নৌ বা অগ্নিকাণ্ডের মত দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয় লোকজনই একমাত্র ভরসা। তাছাড়া ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষেরও গাফিলতি রয়েছে। আমরা এলাকাবাসি চাচ্ছি অতিদ্রুত স্টেশনটি চালু করা হয়।
খালিয়াজুরী উপজেলা শহরের সোহান আহমেদ বলেন, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের মানুষদের সেবা দিতে ফায়ার স্টেশনটি নির্মাণ হলেও চালু হচ্ছে না। স্টেশনটি পড়ে থাকায় অবকাঠামোসহ যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে।
নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এস এ এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি আল আমিন বলেন, তিন বছর আগে খালিয়াজুরী ফায়ার সার্ভিস স্টেশন অফিসের ভবনের কাজ শেষ করেছি। পি ডব্লিউ ডি কর্তৃপক্ষ সহ আমরা একাধিকবার ভবনটি হ্যান্ডওভার করার জন্য ফায়ার সার্ভিসকে বলেছি।
ফায়ার সার্ভিস কতৃপক্ষ ভিজিটও করেছে। কিন্তু তারা রাস্তার অজুহাত দেখিয়ে ভবনটি আর বুঝে নেয়নি। সেটি যদি ২০/৫০ হাজার টাকার বিষয় হতো তাহলে সেটাও সমাধান করতাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর ভবন থেকে অনেক মালামাল চুরি হয়ে গেছে। এবিষয়ে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এখন এর দায়ভার কে নিবে? তারপরও ভবনটি যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ বুঝে নিত তাহলে ক্ষতির পরিমাণটা আর বাড়তো না।
নেত্রকোনা জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারি পরিচালক হাফিজুর রহমান বলেন, হাওরবাসীদের সেবা প্রদানের সব সরঞ্জামাদিসহ ফায়ার স্টেশনটি প্রস্তুত আছে। ২শ মিটার রাস্তা পাকা করা হলে দ্রুত সেবা দেয়া সম্ভব হবে।
খালিয়াজুরীতে ফায়ার স্টেশনটি স্থাপন করা হয়েছে তাতে যেমন আমরা স্থলে কাজ করতে পারবো তেমনি বর্ষায় পানিতেও কাজ করতে পারবো। এখানে স্পীডবোট থাকবে। ডুবুরি দল আছে, ফায়ার ফাইটারও আছে। স্টেশনের ভবণটি প্রায় এক বছর ধরে কাজ সম্পন্ন হয়ে পড়ে আছে।
জনবল এবং গাড়ি পাম্পসহ সবকিছু চলে এসেছে। তবে ডুবুরিদের জন্য সরঞ্জামাধী আসেনি। মূল সড়ক থেকে স্টেশনে প্রবেশের সংযোগ সড়ক নির্মাণ হলেই স্টেশনটি চালু হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে একটা রাস্তা করা হয়েছে। কিন্তু এটি কাঁচা। আমাদের গাড়িগুলো কাঁচা রাস্তায় চলতে পারেনা। রাস্তাটি পাকা হয়ে গেলে স্টেশনটি চালু করতে পারবো। রাস্তাটি দ্রুত পাকাকরণের ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
নেত্রকোনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারজান আনোয়ার বলেন, গণপূর্ত বিভাগের নির্ধারিত কাজ ২০২৩ সালে সম্পন্ন করা হয়েছে। ভবনটি হ্যান্ডওভারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৮বার চিঠি দেওয়া হয়েছে। তারা ভবন বুঝে নিচ্ছেন না।
এতে ভবনের বিভিন্ন মালামাল চুরি সহ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ঠিকাদার আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। রাস্তাটি ব্যাপারে গণপূর্ত বিভাগের কিছু করার নেই। এটি পানি উন্নয়ন বোর্ড এর মাধ্যমে নির্মাণ করা যেতে পারে। তবে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের পরামর্শে গণপূর্ত বিভাগ থেকে রাস্তাটির নির্মাণের জন্য একটি ইস্টিমেট করে ফায়ার সার্ভিসকে দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বনানী বিশ্বাস বলেন, খালিয়াজুরী ফায়ার সার্ভিসের অফিস ভবণ নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ভবনটি হ্যান্ডওভার করতে চাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসকে বলেছি এটি বুঝে নিতে। মূল সড়ক থেকে অফিসে যেতে রাস্তার সমস্যা ছিল।এটিও আমরা নির্মাণ করে দিয়েছি। এখন তারা পাকা করণের কথা বলছে।