পাট সোনালী আঁশ নামে পরিচিত হলেও এই যুগে পাটের কোন পরিচিতিই ছিল না । ইদানিং পলিথিন বাজেয়াপ্ত করার কারণে সোনালী আঁশ আবারও তার পুরাতন ঐতিহ্য আভিজাত্য ফিরে পেয়েছে ।
গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার কৃষকরা পাটের যে উচ্চ মূল্য পেয়েছে, তাতে কৃষকরা পাট চাষে ব্যাপক উৎসাহ বোধ করছে এবং পুরাতন এই বিলুপ্তপ্রায় চাষাবাদে আবার কৃষকরা মনোযোগী হয়ে উঠছে ।
মূলত পলিথিনের উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় পাটকল গুলো বন্ধের কারণে পাট শিল্পের এই দুরবস্থা ।
পাটের চাষাবাদ বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা কৃষি বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক ড. মোঃ সাইখুল আরিফিন বলেন, ‘চলতি বছরে ৩ হাজার ৯ শত ৯৫ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন ৯৫৪৮ মেঃ টন হয়, যা গত বছরে ৪০৮৩ হেক্টর জমিতে ৯৭১৮ মেঃ টন উৎপাদন হয়ে ছিল।’
বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমী রংপুর বিভাগের পাঁচটি জেলায় ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে । উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ছিল ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫৪ বেল পাট । জেলা গুলো হল রংপুর, নীলফামারী, লালমনিহাট, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা ।
রংপুর ডিএই তথ্য মতে, রংপুর বিভাগে ২০২৩ সালে প্রায় ৭০ হাজার কৃষক ৫১ হাজার ৬২৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ করেছিল । তার আগের বছর ২০২২ সালে পাটের জমির পরিমাণ ছিল ৫৬ হাজার ।
এই পরিসংখ্যান গত ১০ বছরে নিয়ে গেলে দেখা যায়, এই অঞ্চলে পাট চাষ কমেছে অন্তত ৪০% আর ২০ বছরের পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যাবে এ অঞ্চলে ৭০% পাট চাষ কমেছে ।
তথ্য মোতাবেক, এক হেক্টর জমিতে কমপক্ষে ৫০ থেকে ১৮ মণ পাট উৎপাদন করা যায় । বর্তমানে এই অঞ্চলে বিভিন্ন বাজারে প্রতি মণ পাট বিক্রি হয় ২৭০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় ।
যা গত বছর ছিল ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা । অন্যদিকে প্রতি মণ পাট কাঠি বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
আমিনুর রহমান একজন কৃষক যিনি প্রতিবছর পাট চাষ করে থাকেন তিনি বলেন, ‘পাটের দাম যাই হোক না কেন আমার জমিগুলো নিচুতে তাই আমাকে পাট চাষ করতেই হয় । কিন্তু এ বছর পাঠের দাম যে এত হবে তা কখনো কল্পনা করতে পারিনি ।
ভালো দাম পেয়েছি সামনের বার আশা করি আরো বেশি পাবো এবং এই চাষ চাষাবাদে আর অবহেলা আর করবো না। কিন্তু কষ্টের বিষয় হলো চাষাবাদ করি কিন্তু সার টাকা দিয়েও পাচ্ছিনা। এইদিকে একটু নজর দিলে আমরা আরো ভালো থাকবো।’
রোকনুজ্জামান লালমনিরহাটের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ের মধ্যে একজন তিনি বলছেন, ‘মৌসুমী ব্যবসায়ী হিসেবে আমরা সব কিছুই কেনাবেচা করি। গত কয়েক বছর ধরে পাটের ব্যবসা নামমাত্র করেছি। শুধু আরত কে টিকিয়ে রাখার জন্য।
গত এক থেকে দেড় মাসে পাট কেনার জন্য দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে এত কল পেয়েছি, যা কল্পনার বাইরে। চাহিদা বেশি হওয়াতে উচ্চ মূল্যে পাট কিনে তা দেশের বিভিন্ন জায়গার পার্টিদের সাপ্লাই দিয়েছি। ব্যবসা এরকম হলে ভালো লাগে।’
দেশের উত্তর অঞ্চলে চাষীরা বিভিন্ন জলাশয়ে সনাতন পদ্ধতিতে পাট চাষ করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফিতা কাটিং পদ্ধতিতে পাট চাষ করলে পানির পরিমাণ কম লাগে । পাটের বাজার মূল্য সঠিক না পাওয়ায় কৃষকরা এই চাষাবাদে খুব একটা মনোযোগী না।
সনাতন পদ্ধতির তুলনায় ফিতা কাটিং পদ্ধতিতে পানির পরিমাণ কম লাগে কিন্তু কৃষকরা ঐতিহ্যগত পদ্ধতি সহজ বিবেচনা করেন বিধায় এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে তাদের অনীহা প্রকাশ করেন।
পাটের আবাদ কম হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে এ অঞ্চলে সময় মতো পানির অভাবে ইদানিং কৃষকরা এই চাষাবাদে অনুপযোগী বলে মনে করছেন ।
মূলত তিস্তা নদীর পানির সঠিক বন্টন হয় না ফলে সেচ প্রকল্প তাতে প্রভাবিত হচ্ছে । এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাত অনিয়মিত হওয়ায় পাট সহ আরও বেশ কিছু ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।