নেত্রকোনা প্রতিনিধি :
কীটনাশকের ব্যবহারে মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান মুলক সমীক্ষায় নেত্রকোনায় বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইনডিজেনাস নলেজ (বারসিক) এর আয়োজনে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব বিষয়ক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বুধবার বেলা ১১ টায় মুক্তারপাড়া জেলা প্রেসক্লাবের মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সমীক্ষার বিষয়টি তুলে ধরেন বারসিক এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী ওয়াহিদুর রহমান, অধিকমাত্রায় ও নিয়ম বর্হিভূতভাবে কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটি-পানি-বায়ু দূষণ ও মৌমাছি, ব্যাঙ, কেঁচো সহ মাটির অনুজীবের বিলুপ্ত হচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় তৈরী হচ্ছে।
পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের উপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইন্সটিটিউটের করা এক জরিপে ক্যান্সারে আক্রান্ত পুরুষ রোগীর মধ্যে ৬৪ ভাগ কৃষি কাজের সাথে জড়িত। প্রতি বছর কৃষকদের ক্যান্সারে আক্রান্তের সংখ্যা উর্ধ্বমুখী হতে দেখা যাচ্ছে।
কৃষকদের দেরিতে ক্যান্সার শনাক্ত হয়। আর তারা খালি পায়ে, খালি গায়ে, পিপিপি, মাস্ক, গ্লাভস ছাড়াই কীটনাশক জমিতে ব্যবহার করে। হাত লাগিয়ে মাটি ও পানির মধ্যে কাজ করে। জমিতে যে কীটনাশক তারা দেয় তা নিয়মিত কৃষকের সংস্পর্শে আসে।
কৃষিশ্রমিকের খরচ কমাতে আগাছা নাশকের ব্যবহার বাংলাদেশে এখন অনেক বেশি হচ্ছে। যেমন ‘এলড্রিন, ডাইএলড্রিন, ‘ডিডিটি, ‘এনড্রিন, ইত্যাদি। বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিক’র উদ্যোগে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের উপর কীটনাশকের প্রভাব এ বিষয়ে মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধ্যানমূলক সমীক্ষা করা হয়। গবেষণার জন্য নেত্রকোনা সদর ও আটপাড়া উপজেলার ৫ টি গ্রামের ২৩ জন কৃষকের সাথে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় এবং বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে মতামত গ্রহন করা হয়।
Endosulfan, heptachlor, Carbofuran, Aluminum phosphide, Glyphsate, pyrethroide, paraquat, Di-clofenac, DDT(Dichlorodiphenyltrichloroethane), Aldrin, Dieldrin, Endrin,Heptachlor, Chlordane, Methyl Parathion Ethyl Parathion, Monocrotophos Phosphamidon, Methyl, Bromide, Endosulfan, Hexachlorobenzene, Toxaphene, Mirex, Dicrotophos, Disulfoton, Mercury compounds.
এসব নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিষয়ে তারা জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ কীটনাশক এখন বিভিন্ন নামে বাজারজাত হচ্ছে। খুব সতর্ক ভাবে বেঁচাকেনা করে। কৃষকেরা কান্ডারী ৫ জি, গ্রীনফোম, ইউনিকোয়াট, রাজটক্স ব্যবহার করেন যা এগুলোর জেনেরিক নাম Carbofuran, Aluminum Phosphide, Paraquat কে নির্দেশ করছে। ভিরতাকো বুলেট, কান্ডারী ৫জি, গ্রিনফোম, ইরেজার, ইউনিকোয়াট, রাজটক্স, সোর্ড, বায়োগ্রীন, সুপার গোল্ড, নাইট্রো, সিলেক্ট গ্লাস, রাইস, রিফিট, বাসুডিন, কে-টু, রাজধান, কমরেড, নির্মূল, জায়ডিন নামের কীটনাশকগুলো বেশী ব্যবহার করে।
কৃষকেরা বলেছেন, মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব, বমি, ডায়রিয়া, দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, উচ্চরক্তচাপ, বিষন্নতা, উদ্বেগ, খাবারের অরুচি, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, স্নায়ু দুর্বলতা, ত্বকের রোগ, ঘুম কম হওয়া, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং লিভারের রোগ, কিডনির সমস্যা, পুরুষের বন্ধ্যাত্ব ও নারীর বন্ধ্যাত্ব, প্যারালাইজড, ফুসফুসে ক্যান্সার, চোখের ছানি, পা ভারী হয়ে যায়, বুক ব্যাথা হার্টের সমস্যা। তবে এসব রোগ কীটনাশকের কারনেই যে হয়েছে তা গবেষণার প্রয়োজন আছে। ২৩ জন কৃষক গত এক বছরে চিকিৎসা বাবদ খরচ করেছেন: ১৭ লাখ ৭৯ হাজার টাকা। তারা বলেছেন, নিজে শুধুই না পরিবারের অন্যরাও যেমন নারী, শিশুরা আক্রান্ত হয়।
সব কৃষকেরই কীটনাশক ক্রয়ের সময় কোন রশিদ নিতেন না। কীটনাশক ব্যবহারের সময় কোন পিপি, মাস্ক, গ্লাবস ব্যবহার করেন না। এ বিষয়ে সচেতনতার অভাব। সরকারীভাবে কোন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়না। কীটনাশকের লেভেলে বিপদ ও সতর্কতামূলক কথা অনেকেই পড়েন না।
কীটনাশক মানব দেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কীটনাশক ব্যবহারে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। কৃষি কাজে এর ব্যবহার অতিরিক্ত হওয়ায় দিন দিন আমরা এটিকে স্বাভাবিক ভাবেই দেখতে শুরু করেছি। কীটনাশকের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার জলাভূমির পানি নষ্ট হয়ে মাছের বংশবৃদিধ কমে যাচ্ছে। মাছ, ব্যাঙ, কেঁচো, শামুক, ঝিনুক, মাটির অনুজীব, পাখি, মৌমাছি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে কীটনাশকের অবাধ ব্যবহাকে কৃষকেরা দায়ী মনে করে।
যে সুপারিশ গুলো মাঠ ও বিশেষজ্ঞ পর্যায় থেকে ওঠে আসে তা হলো:
১। কৃষকদের সচেতনতার জন্য স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ ও আলোচনা অনুষ্ঠান করা দরকার। ২। নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার, বাজারজাতকরন, সংরক্ষণ, বিক্রি যাতে না করতে পারে তার জন্য মনিটরিং বাড়াতে হবে ৩। অনুমোদনহীন কীটনাশকের দোকান বন্ধ করা হবে ৪। অর্গানিক কৃষিচর্চা বাড়াতে সরকারী বেসরকারী সহযোগিতা বাড়াতে হবে ৫।
কীটনাশকের ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ কীটনাশক বিষয়ে কৃষকের কাছে তথ্য ঘাটতি আছে যা জানানো জরুরি ৬। কৃষককে কৃষিকর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ি কীটনাশক ব্যবহার করতে হবে ৭। কীটনাশক ব্যবসায়ীদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালা করতে হবে ৮। আইনসঙ্গতভাবে অনুমোদিত সঠিক মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করা ৯। কীটনাশক ব্যবহারের সময় কৃষক কোন পিপি, মাস্ক, গ্লাবস ব্যবহার করেন না অবশ্যই ব্যবহর করতে হবে ১০।
মাঠ পর্যায়ে নিষিদ্ধ কীটনাশকের তালিকা ও অপকারীতা বিষয়ে বিলবোর্ড স্থাপন করতে হবে ১১। জেলায় কত কীটনাশক বিক্রি হয় তার কোন তথ্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে হিসাব নেই ১২। ব্যক্তিগত সুরক্ষামূলক উপকরণ (পিপিপি), গ্লাভস, মাস্ক বিনামূল্যে কৃষক এবং কৃষি শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ করা ১৩। নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার ও বিক্রয় তদারকী আরো জোরদার করা করতে হবে।
বারসিকের পক্ষথেকে নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার, বাজারজাতকরন, সংরক্ষণ, বিক্রি যাতে না করতে পারে তার জন্য মনিটরিং বাড়ানো নিয়ন্ত্রণ, জৈবকীটনাশকের ব্যবহার বাড়ানো প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ- মাছ, ব্যাঙ, কেঁচো, শামুক, ঝিনুক, মাটির অনুজীব, পাখি, মৌমাছিসহ সকল প্রাণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবী জানাই।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রেসক্লাবে সাধারণ সম্পাদক ম কিবরিয়া চৌধুরী হেলিম, সাবেক সহ-সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, বাসস এর নেত্রকোনা সাংবাদিক তানভীর হায়াত খান প্রমুখ।