চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি:
চুয়াডাঙ্গায় লটারিতে নির্বাচিত সন্তানদের ভর্তির দাবিতে অবরোধ করে অনশনে কর্মসূচি পালন করেছে অভিভাবকরা।
আজ রবিবার (২২ ডিসেম্বর) সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাদিন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের প্রধান ফটক অনশন করে তারা।
জানা গেছে, গত কয়েক বছর ধরে লটারি ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। এবার চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া জুবিলি (ভিজে) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তির লাটারি শুরু হয়। সেই মোতাবেক গত মঙ্গলবার (১৭ ডিসেম্বর) অনলাইনের মাধ্যমে যারা নির্বাচিত হয়েছে। ১৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় ভর্তির কার্যক্রম। যা তাদের ভর্তির শেষ তারিখ ছিলো রবিবার (২২ ডিসেম্বর)। কিন্তু লটারিতে নির্বাচিত প্রায় ১০০ শিক্ষার্থী বয়সের কারণে এখনো ভর্তি হতে পারেনি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৯ বছর বয়স পার হলে তারা তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে না। সেহেতু সন্তানদের বয়স ৯ বছর পার হওয়া সত্ত্বেও সেইসব শিক্ষার্থীদের ভর্তির দাবিতে অভিভাবকরা এই অনশন করছেন।
ফলাফলে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৩৫ জন ও ভিক্টোরিয়া জুবিলি (ভিজে) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৮ জন নির্বাচিত শিক্ষার্থীর বয়স সরকার নির্ধারিত বয়স ৯ বছর পার হয়ে যাওয়ায় তারা ভর্তি হতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফরম পূরণ করে তারা নির্বাচিত হলেও পরবর্তীতে অভিভাবকদের জানানো হয়েছে যে, তাদের সন্তানদের ভর্তি করা অসম্ভব। কারণ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হতে বয়সসীমা ৮ বছর বা তার অধিক করা হয়। সেক্ষেত্রে ৯ বছর পার হলে নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি করা সম্ভব নয়।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটির পায়রা আক্তার। তার মেয়ে জাবিয়া ইসলাম জারা অনলাইনে আবেদন করে নির্বাচিত হয়েছে। তবে জারার বয়স ৯ বছর ১ মাস হওয়ায় সে ভর্তি হতে পারেনি। জারার মা পায়রা বলেন, আমার মেয়ে চান্স পেয়েছে। আমরা সবাইকে জানিয়েছি, মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করেছি। এখন ভর্তি করা যাচ্ছে না। আমরা অনশন করছি। এর সমাধান করেই বাড়ি ফিরবো।
অনশনে থাকা এনি খাতুন, বকুল হোসেন ও মোমিন জোয়ার্দ্দারসহ আরও কয়েকজন অভিভাবক বলেন, বয়স বেশির কারণে যদি ভর্তি হতে না পারে, তাহলে আবেদন করার সুযোগ দিলো কেন? এছাড়া গত দুদিন ধরে একবার স্কুলে একবার ডিসি অফিসে ঘুরতে ঘুরতে আমরা চরম ভোগান্তির মধ্যে। তারা আরও বলেন, আমাদের সন্তানদের ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত আমরা অনশন ছাড়ছি না।
চুয়াডাঙ্গা পৌরসভার হাজরাহাটি গ্রামে বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন জানান, আমি আমার ছেলের জন্য চুয়াডাঙ্গা কালেক্টর স্কুল ও ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মেহেরপুরে একটি স্কুল ও ঝিনাইদহে একটি স্কুলে ফর্ম তুলেছি। এর মধ্যে লটারিতে চুয়াডাঙ্গা ভি.জে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও ঝিনাইদহ সরকারি স্কুলে নাম ওঠে মর্নিং শিফটে। যেহেতু আমরা বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সেহেতু আমি ভি.জে স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করানো জন্য যাই। ভর্তি করতে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ জানায়, আমার ছেলের বয়স না-কী ২৪ দিন বেশি। এ কারণে আমার ছেলেকে ভর্তি নেয়নি। এরপর আমি ঝিনাইদহে যোগাযোগ করেছি। সেখান থেকে একজন শিক্ষক আমার মোবাইলে একটি নীতিমালার পত্র দিয়েছে। তাতে লেখা আছে ৯ বছরের অধিক শিশুদের ভর্তি করা যাবে। এ নীতিমালা মেনে আমাদের আশেপাশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহে ভর্তি করানো হচ্ছে। শুধুমাত্র আমাদের চুয়াডাঙ্গাতে কেন এর ব্যতিক্রম। আমরা অভিভাবকরা আজ সকলে জেলা প্রশাসকের কাছে এসেছি তিনি একটা সমাধান দেবেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার জাফরপুর এলাকার এক শিক্ষার্থীর মা নওশিন ইয়াসমিন জানান, আমার মেয়ে চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পরেও ভর্তির দোহায় দিয়ে তা বাতিল করা হয়েছে। যখন আমি ভর্তির জন্য এপ্লাই করছি তখন অনলাইনে একসেফট করে নিচ্ছে আমার মেয়ের লিস্টে নাম চলে এসেছে, এখন উনারা রিজেক্ট কেন করতেছে। কেন বলতেছে বয়স বেশি হয়ে গেছে। উনারা ১৭ তারিখে কেন বয়সের এ ব্যাপারটা জানালো। আমরা কি জ্যোতিষি যে আগে থেকে সবকিছু জানি। এতগুলো ছোট বাচ্চা তাদের ইমোশন নিয়ে খেলার মানে কী? আমার বাচ্চা বুধবার থেকে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
মানসিকভাবে সে এতোটা ভেঙে পড়েছে এর দায়ভার কে নিবে? তার শিক্ষা জীবনের শুরুতেই যদি এতো জটিলতা তৈরী হয় তার সারাটা জীবন কেমন কাটবে? শিক্ষা ব্যবস্থা কিসের উন্নতি হচ্ছে? এটা না স্বাধীন বাংলাদেশ? শিক্ষার জন্য এতোকিছু করলো, অধিকারের জন্য এতোকিছু করলো তাহলে এখন এতো অনিয়ম কেন? তার থেকে বড় কথা পার্শ্ববর্তী সব জেলাতেই ভর্তি নিচ্ছে। সব জায়গায় নিলে ওনারা কেন নিবেন না? চুয়াডাঙ্গা কী বাংলাদেশের বাইরে? আমাদের দাবি যতগুলো বাচ্চা চান্স পাইছে সবগুলোকে ভর্তি নিতে হবে। আমাদের একটাই দাবি এই বাচ্চাগুলোকে কোনভাবেই বাদ দেয়া যাবে না।
যতগুলো বাচ্চা চান্স পাইছে সবগুলো বাচ্চাকে ভর্তি নিতে হবে। আমরা যখন বুধবার গেলার স্কুলে ভর্তি করাতে গেলে কাগজপত্র জমা নিতে ভর্তি ফরম নিতে গেলে আমাকে আর ভর্তি ফরম দেননি। উনারা তখন বলেন বয়স বেশী হওয়ায় ভর্তি করানো যাবে না। আমি ফরম না পেয়ে ঘটনাটি প্রধান শিক্ষককে অবহিত করি। উনি ওই সময় বলেছিলেন আমার স্কুলে যারা চান্স পেয়েছে সবাইকে ভর্তি করাবো অথচ আজ উনি উল্টো কথা বলছেন। এখন উনি সকল অভিভাবককে বলছেন না আমি এ ব্যাপারে কথা বলতে আসি নই। আমাদের কথার কোনো মূল্য নাই। আমার মেয়ের স্বপ্ন গার্লস স্কুলে পড়বে? তাহলে এতোবড় স্বপ্ন উনি ভেঙে দিতে পারেন না। প্রথম স্টেপে আমার মেয়েকে একসেপ্ট করছে, সেকেন্ড স্টেপে একসেপ্ট করছে এখন থার্ড স্টেপে ভর্তি করানো সময় স্কুল কর্তৃপক্ষ যদি না করে এটা কোন নিয়ম। এটাতো কোনো নিয়ম হলো না। এটা আমরা কোনমতে মানি না, মানবো না। প্রধান শিক্ষক এখনও আমাদের কোন আশ্বাস দিচ্ছেন না। আমরা সমাধান না নিয়ে এখান থেকে যাবো না। জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাদের একটা আশ্বাস দিলে তবেই আমরা এখান থেকে যাবো।
চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিলারা চৌধুরী বলেন, আমার স্কুলে দুই শিফটে ২১০ জন করে ভর্তি হবে। ভর্তি প্রায় শেষ। তবে কিছু শিক্ষার্থী বয়সজনিত জটিলতায় ভর্তি হতে পারছে না। এটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দেখবেন। আমি অলরেডি জেলা প্রশাসক মহোদয় ও শিক্ষা বোর্ডে বিষয়টি জানিয়েছি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক জহিরুল ইসলাম জানান, আমি বোর্ডের সাথে কথা বলেছি। স্কুল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি যারা চান্স পেয়েছে নিয়ম অনুযায়ী তাদের সকলকে ভর্তি করাতে হবে।
উল্লেখ্য, চুয়াডাঙ্গা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া জুবিলি (ভিজে) সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে দুই শিফটে ৪৪০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে। এর মধ্যে দুটি স্কুলে বয়স জটিলতায় প্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারছে না। আর আজ পঞ্চাশের অধিক অভিভাবক এই অনশন করছেন।