মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি
মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ঘুষ, অনিয়ম ও একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কার্যালয়ের স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমান, যিনি প্রায় ৩৫ বছর ধরে বিভিন্ন প্রভাব ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একই কর্মস্থলে বহাল আছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও কার্যক্রমে অঘোষিত প্রভাব বিস্তার করে আসছেন তিনি। জেলা জুড়ে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকগুলোর লাইসেন্স প্রদান ও নবায়ন প্রক্রিয়ায় তার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের লাইসেন্স নবায়ন কিংবা নতুন লাইসেন্স পেতে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারী ও জেলার কিছু ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক জানান, জেলার প্রায় ৯০ শতাংশ ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকের লাইসেন্স নিয়মিত নবায়ন করা নেই। তবে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকার বিনিময়ে চুক্তি হলে লাইসেন্স নবায়নের প্রয়োজন পড়ে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অভিযান শুরুর আগেই চুক্তিবদ্ধ মালিকদের সতর্ক করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তারা।
সূত্র জানায়, মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ১৯৮৮ সালের দিকে স্টেনোটাইপিস্ট পদে যোগদান করেন মো. মিজানুর রহমান। ১৯৯৯ সালে তাকে ঢাকায় বদলি করা হলেও ২০০১ সালে আবার মুন্সিগঞ্জে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে পিরোজপুরে বদলি করা হলেও তিনি হাইকোর্টে রিট করে সেখানে যোগদান না করে মুন্সিগঞ্জেই থেকে যান।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ঢাকা থেকে জারি করা এক স্মারকে তাকে মুন্সিগঞ্জ থেকে মাদারীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে বদলির নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই আদেশে ৫ কর্মদিবসের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ ছিল। অন্যথায় ৬ষ্ঠ কর্মদিবস থেকে তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অব্যাহতি হিসেবে গণ্য করার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে ওই আদেশের বিরুদ্ধেও তিনি হাইকোর্টে রিট করেন এবং মুন্সিগঞ্জেই কর্মরত থাকেন।
এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন সেক্টরে তার কয়েকজন আত্মীয়-স্বজন কর্মরত রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি মুন্সিগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের দুই অ্যাম্বুলেন্স চালক জসিম ও মনিরের বিরুদ্ধে অ্যাম্বুলেন্স বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। একটি পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের বদলি করে। তবে পরে তারা হাইকোর্টে রিট করে আবারও একই পদে যোগদান করেন বলে জানা গেছে।
আরেকটি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের ছুটি নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যান মিজানুর রহমান। দেশে ফেরার সময় অবৈধভাবে স্বর্ণ ও সৌদি রিয়াল আনার অভিযোগে সৌদি ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক হন তিনি। পরে প্রায় দুই মাস সৌদি কারাগারে থাকার পর দেশে ফেরেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন লাইসেন্স নবায়নের জন্য চেষ্টা করেও কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পেতেও প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ করতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও স্টেনোটাইপিস্ট মো. মিজানুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. কামরুল জমাদ্দারকে মিজানুর রহমানের ঘুষ গ্রহণের একটি ভিডিও ফুটেজ দেখানো হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “ভিডিওটি দেখেছি। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, সরকারি চাকরিতে নির্দিষ্ট সময় পর বদলির নিয়ম থাকলেও দীর্ঘ ৩৫ বছর একই কর্মস্থলে থাকা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করেছে। তারা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সচেতন মহলের প্রত্যাশা, যথাযথ তদন্ত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জের স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান অনিয়ম দূর হবে এবং জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে।