সাংবাদিকের করা চাঁদাবাজির মামলায় এক মাস পর গ্রেপ্তার হওয়া ১৭ বছর বয়সী জুলাইযোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ১০ দিন কারাভোগের পর আজ সোমবার (৫ জানুয়ারি) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আদালতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সাধারণ মানুষ। অভিযোগ উঠেছে, ১৮ বছরের নিচে বয়স হওয়া সত্ত্বেও সুরভীর মামলা শিশু আদালতে না নিয়ে এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পরিচালনা করা হয়েছে, যা সরাসরি আইনের লঙ্ঘন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২৬ নভেম্বর সাংবাদিক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের দায়ের করা চাঁদাবাজির মামলার পরপরই সুরভী নিজেও ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা করেন। তবে চাঁদাবাজির মামলার পর এই অভিযোগ দায়ের হওয়ায় বিষয়টি স্পর্শকাতর হলেও পুলিশ সেই মামলাটিকে গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
আজ সোমবার আদালতে তোলার আগেই ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হলেও গাজীপুরের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত সুরভীর রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অভিযোগ রয়েছে, জন্মসনদে বয়স ১৭ বছর প্রমাণিত হলেও পুলিশের দেওয়া তথ্যে তাকে ২১ বছর ধরে নিয়েই রিমান্ড দেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তার শিক্ষাজীবনের ক্ষতির বিষয়টিও গুরুত্ব পায়নি। জানা গেছে, আগামী ১২ ডিসেম্বর একাদশ শ্রেণির অর্ধবার্ষিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল সুরভীর। কিন্তু গ্রেপ্তার, কারাবাস ও রিমান্ডের কারণে তার পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কালিয়াকৈর থানা সূত্র জানায়, ২৬ নভেম্বর বাংলাদেশ প্রতিদিনের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার (বর্তমানে কালবেলা) নাঈমুর রহমান দুর্জয় সুরভীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেন। প্রায় এক মাস পর ২৫ ডিসেম্বর রাতে বাসা ঘেরাও করে ঘুমন্ত অবস্থায় তাকে আটক করা হয়। পরদিন চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।
সে সময় পুলিশের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, সুরভীর বিরুদ্ধে অন্তত ৫০ কোটি টাকার চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ ছাড়া আর কিছু নেই। মামলার এজাহারে তার বয়স ২০ এবং এফআইআরে ২১ বছর উল্লেখ করা হলেও জন্মসনদ অনুযায়ী প্রকৃত বয়স ১৭ বছর ১ মাস ৭ দিন। আজ সোমবার পুলিশের ৭ দিনের রিমান্ড আবেদনের পর আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দুর্জয়ের দায়ের করা মামলার দুই দিন পর সুরভী তার বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ আনেন এবং পরদিন তা মামলায় রূপ নেয়। কিন্তু ওই মামলাটি কার্যত ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উভয় মামলা রেকর্ড করেছিলেন তৎকালীন ওসি মো. আব্দুল মান্নান। তিনি বলেন, “আমি মামলা রেকর্ড করলেও ৭ ডিসেম্বর আমার ট্রান্সফার হয়ে গেছে। এসব বিষয়ে আমি এখন আর সম্পৃক্ত নই।”
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই ওমর ফারুকের সঙ্গে প্রাথমিকভাবে কথা হলেও ধর্ষণচেষ্টার মামলার বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন করলে তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমান ওসি খন্দকার নাসির উদ্দিন বলেন, নতুন যোগ দেওয়ায় তিনি মামলার বিষয়ে অবগত ছিলেন না, পরে কথা বলবেন বললেও আর সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের সলিসিটর ব্যারিস্টার বিপ্লব কুমার পোদ্দার বলেন, পরীক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়া সম্পূর্ণ ভুল। তার ভাষায়, “এখানে একটি বড় চক্র কাজ করছে। বিষয়টি রিট হলে আদেশ দেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট ফেস করবেন।” চাঁদাবাজি ও ধর্ষণচেষ্টার মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুটো অভিযোগই গুরুতর এবং কোনোটিই কম গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ নেই। কোনটি আগে বা পরে হয়েছে, তা নয়; এখানে প্রমাণই মুখ্য।
তিনি আরও বলেন, সুরভীকে পূর্ণবয়স্ক হিসেবে扱া করে রিমান্ডে নেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। “এই মামলায় তার বিষয়টি শতভাগ শিশু আদালতের এখতিয়ারভুক্ত,” বলেন তিনি।