সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের বিপুল বিজয়ের পর নতুন করে আশার আলো দেখছে বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতন। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে বিশেষ করে বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত সম্পর্ক আবারও গতিশীল হয়ে উঠবে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সময়ে দুই দেশের সাংস্কৃতিক যোগাযোগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরে দুই বাংলার যে ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন ছিল, তা দৃশ্যত দুর্বল হয়ে যায়।
শান্তিনিকেতনে ঠাকুর পরিবারের বংশধর সুদৃপ্ত ঠাকুর বলেন, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই সীমান্তের এপারে, বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাংস্কৃতিক উপস্থিতি ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অবনতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
তিনি বলেন,
“প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বাংলাদেশে ক্ষমতায় এসেছে—এতে আমরা খুবই আনন্দিত। আমরা আশা করি, নতুন সরকার বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিত্তিকে রক্ষা করবে। সেই সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথকেও মর্যাদা দেবে।”
২০১৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যৌথভাবে শান্তিনিকেতনের বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধন করেন। বিশ্বভারতী ও বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা বিনিময়ের উদ্দেশ্যে এই ভবনটি নির্মিত হয়। বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত ভবনটিতে রয়েছে সম্মেলনকক্ষ, গ্রন্থাগার ও জাদুঘর। সম্মেলনকক্ষ ও গ্রন্থাগার চালু থাকলেও ২০২০ সালের কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় বন্ধ হওয়া জাদুঘরটি আর খোলা হয়নি।
সূত্রের দাবি, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশের একদল কর্মকর্তা জাদুঘরটি নতুন করে সাজান। কিন্তু ২০২৪ সালের জুনে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর তা আর উদ্বোধন করা যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্বভারতীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন,
“জাদুঘরে শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক স্মারক ছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জাদুঘরটি না খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ এতে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব পড়তে পারত। এরপর বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা সবার জানা। মৌলবাদী শক্তিগুলো ভারতবিরোধী এবং এমনকি রবীন্দ্রনাথবিরোধী হয়ে উঠেছিল।”
তিনি আরও বলেন,
“এখন আমরা (বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত) তারেক রহমানের বক্তব্য শুনেছি। তিনি সম্প্রীতির বার্তা দিয়েছেন এবং আশ্বাস দিয়েছেন, ইউনূস আমলের অস্থিরতা শেষ হবে। আমরা আশা করি, এখন জাদুঘরটি পুনরায় খোলার প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা যাবে। অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দপ্তরের সম্মতি নিয়ে।” ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশ্বভারতীর আচার্য।
বাংলাদেশে ছায়ানটসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনা এবং রবীন্দ্রনাথ-সংক্রান্ত স্থাপনা ভাঙচুরের অভিযোগ দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নাড়া দেয়। রবীন্দ্রনাথ শুধু দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু নন, তাঁর লেখা “আমার সোনার বাংলা” বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ফলে রবীন্দ্রচর্চার ওপর আঘাতকে অনেকেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক সংকট হিসেবে দেখেছেন।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ভারতের বিশ্বভারতী ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ভিসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের অভিযোগ ওঠে। অনেক শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও ভিসা পাননি।
বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনের পিএইচডি গবেষক অমৃতা সরকার বলেন,
“এক মাস আগে আমি ভিসা পেয়েছি। তার আগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। বিশ্বভারতীতে পড়া অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী একই সমস্যায় পড়েছিল। বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জেতায় আমরা খুবই আশাবাদী। আগের মতো পরিস্থিতি আর থাকবে না বলে মনে করছি।”
অমৃতার বাড়ি বাংলাদেশের মেহেরপুরে।
বিশ্বভারতীর দীর্ঘদিনের কর্মকর্তাদের মতে, ২০০০ সালের শুরুর দিকে বিএনপি সরকারের সঙ্গে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক ছিল। জনসংযোগ কর্মকর্তা অতিগ ঘোষ বলেন,
“বিএনপি সরকারের আগের মেয়াদে আমাদের অভিজ্ঞতা খুবই ভালো ছিল। দলটি আবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় এসেছে। আমরা আশাবাদী। ২০০০ সালের শুরুর দিকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার আমলে সরকারের সঙ্গে বিশ্বভারতীর খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। আমরা নিশ্চিত, সম্পর্ক আবারও সৌহার্দ্যপূর্ণ হবে।”
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?