জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের গণভোটে ‘না’ ব্যালটে সিল মারতে দলের নেতাকর্মী ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার মধ্যরাতে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, দেশ এক চরম সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং সংবিধান নিয়ে সুপরিকল্পিত প্রতারণার আড়ালে বড় ধরনের পরিবর্তন চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী,
বিভ্রান্তিকর চারটি বিবৃতির আড়ালে ৩৮টি পরিবর্তন লুকিয়ে রাখা হয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে দেশে সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হবে। এ কারণে তিনি স্পষ্টভাবে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
জিএম কাদের বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন এবং দলগতভাবেও জাতীয় পার্টি সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে। রংপুরে দলের দুই কর্মী শহীদ হয়েছেন, চারজন কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, শহীদ ও নির্যাতিতদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় পার্টি অঙ্গীকারাবদ্ধ।
রাষ্ট্র ও সংবিধানের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করলেও জিএম কাদের বলেন, এসব সংস্কার অবশ্যই সংবিধানসম্মত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হতে হবে। নির্বাচিত সংসদ, সরকার ও জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অস্বচ্ছ ও বেআইনি প্রক্রিয়ায় চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, বর্তমান হ্যাঁ-না ভোটের আয়োজনের মধ্যেই সেই অগ্রহণযোগ্য উদ্যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ভিডিও বার্তায় তিনি অভিযোগ করেন, দেশে বিদ্বেষ ও বিভাজন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ১৮ কোটি মানুষ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। ইনসাফ ও সাম্যের কথা বলে চরম বৈষম্য ও দখলদারিত্বের এক অমানবিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও দোকানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েও এসব ঘটনা ঘটছে, অথচ রাষ্ট্র নির্বিকার। দিনেদুপুরে হত্যাকাণ্ড ও মৃতদেহ পোড়ানোর অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পূর্বলক্ষণ।
অর্থনীতির প্রসঙ্গ টেনে জিএম কাদের বলেন, গত কয়েক মাসে শত শত কলকারখানা বন্ধ হয়েছে, বেকারত্ব বেড়েছে এবং ব্যাংক রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থা জনগণের অজানা। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ হারানোর অভিযোগের পাশাপাশি নারীদের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, শিল্প-সংস্কৃতি দমিয়ে রাখা হচ্ছে, নারীর শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে চলাচলও ঝুঁকির মুখে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের আহ্বান জানিয়ে জিএম কাদের বলেন, রাষ্ট্র ও সমাজের ছিন্ন হওয়া বন্ধনগুলো আবার জোড়া লাগাতে হবে। তিনি এমন বাংলাদেশের কথা বলেন, যেখানে নারীকে পোশাকের জন্য হেনস্তা হতে হবে না, শিক্ষক লাঞ্ছিত হবেন না, শিল্পী ও ভিন্নমতের মানুষের কণ্ঠরোধ হবে না এবং প্রত্যেক নাগরিক সমান অধিকার ও মর্যাদা পাবে।
শেষাংশে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে দুটি পক্ষ রয়েছে, একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭১-এর পক্ষে, অন্যটি সেই আদর্শবিরোধী শক্তি। লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান তিনি। বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান, নারী-পুরুষ ও সব জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়ে জিএম কাদের বলেন, অরাজকতা ও বিচারহীনতা বন্ধ করতে এবং গণতন্ত্র রক্ষায় লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দিতে হবে।