শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ইনকিলাব মঞ্চের চলমান আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসে, যা রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) রাতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, যত দ্রুত সম্ভব এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেওয়া হবে।
প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার এ মামলায় পূর্ণ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অটল। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে কিংবা যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়ায় সরকার সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে।” তিনি আরও বলেন, হাদি হত্যাকাণ্ড একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার ইস্যু, যেখানে সত্য উদঘাটন ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। সরকারের এই অবস্থান একদিকে যেমন আন্দোলনরত পক্ষগুলোর দাবিকে আংশিকভাবে স্বীকৃতি দেয়, তেমনি দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার ওপর জনআস্থার সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে।
এর আগে শহিদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যার আন্তর্জাতিক মানের তদন্তের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ইনকিলাব মঞ্চ ও শহিদ হাদির পরিবার। বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী এবং শহীদের স্ত্রী সেখানে জড়ো হন। আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা নেই বলেই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলতে বাধ্য হয়েছেন।
ইনকিলাব মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার মুখপাত্র ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, সরকার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন আন্দোলনে ইনকিলাব মঞ্চ সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছে। কিন্তু হাদি হত্যার বিচার ও তদন্তের দাবিতে বারবার সহযোগিতা চাইলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, “এই কারণেই জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে আমরা যমুনার সামনে অবস্থান নিয়েছি।” এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের গভীর সংশয় রয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুর্বৃত্তরা শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এতে তার মাথা ও ডান কানের নিচে গুলি লাগে এবং তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক সপ্তাহ পর, ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। এই হত্যাকাণ্ডের ধরন, সময় ও প্রেক্ষাপট জনমনে প্রশ্ন তুলেছে যে এটি নিছক অপরাধ নাকি এর পেছনে সংগঠিত কোনো শক্তি কাজ করেছে।
হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্তের দাবিতে এখনো রাজপথে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে ইনকিলাব মঞ্চ ও শহিদের পরিবার। এই আন্দোলন শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং দেশের বিচারব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে তদন্তের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে তা একদিকে যেমন সত্য উদঘাটনে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিচার কাঠামোর সীমাবদ্ধতাও উন্মোচিত করবে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কতটা দ্রুত ও আন্তরিক ভূমিকা রাখে।