আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ অংশগ্রহণমূলক, শঙ্কামুক্ত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সশস্ত্র বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সোমবার সেনাসদরের হেলমেট অডিটোরিয়ামে সশস্ত্র বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ নির্দেশনা দেন বলে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এবারের নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক তরুণ প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। পাশাপাশি এমন অনেক নাগরিকও রয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এই বাস্তবতায় সকল ভোটারের জন্য ভয়মুক্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি বড় দায়িত্ব।
তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক বাস্তবতায় সশস্ত্র বাহিনী এই দায়িত্ব পালনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সক্ষম, পেশাদার, নিরপেক্ষ ও জনমুখী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে পৌঁছালে প্রধান উপদেষ্টাকে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা অভ্যর্থনা জানান। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং জুলাই–আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান এবং দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন। ফ্যাসিবাদ-পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা জাতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত একটি জাতি জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে, তার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। গণভোটে জনগণ ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে মতামত দেবে এবং সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সেই মতামত বাস্তবায়নের জন্য যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবে।
তিনি বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। প্রতিটি নাগরিক যেন কোনো ভয় বা প্রভাব ছাড়া ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, সে লক্ষ্যে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়ার জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে।
নির্বাচনকালে মাঠপর্যায়ে সব সিদ্ধান্ত যেন আইনসম্মত, সংযত ও দায়িত্বশীল হয়—সে বিষয়ে শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, সামান্য কোনো বিচ্যুতিও যেন জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, তরুণ ও দীর্ঘদিন ভোটাধিকার বঞ্চিত নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে এবারের নির্বাচন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। তাই ভয়মুক্ত পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
ড. ইউনূস বলেন, দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে উদ্যোগ নিয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও যেকোনো আগ্রাসন মোকাবিলায় যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।
তিনি জানান, সশস্ত্র বাহিনীর স্বনির্ভরতা বাড়াতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সামরিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম উৎপাদন কারখানা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস ও মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং ইতালি, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে অনুরূপ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা ও আভিযানিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নেওয়া এসব উদ্যোগ ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকারও অব্যাহত রাখবে—এটাই জাতির প্রত্যাশা।
মতবিনিময় সভায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথি এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।