বিএনপির চেয়ারপারসন তারেক রহমান বলেছেন, গত ১৫ বছর ধরে জনগণের ভোটাধিকার জোরপূর্বক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এখন যখন আবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথচলা শুরু হয়েছে, তখন একটি মহল নতুন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। তিনি ভোটারদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভোট দেওয়ার অধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা যেন কোনো ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবারও হরণ না হয়—সে বিষয়ে সবাইকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে।
শনিবার সন্ধ্যায় ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপি আয়োজিত এই সমাবেশে ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থীরা মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে ফেনীসহ আশপাশের জেলা থেকে কয়েক হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।
বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী বাস জনসভাস্থলে পৌঁছায়। মাগরিবের নামাজ আদায়ের পর তিনি মঞ্চে ওঠেন। প্রায় দুই দশক পর ফেনীতে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে অংশ নিয়ে টানা প্রায় ২৫ মিনিট বক্তব্য দেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, “বিএনপি সরকার গঠন করলে দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানে কাজ শুরু করবে। আমাদের একটাই লক্ষ্য—দেশ গড়া। আমরা যদি এই দেশ গড়ে তুলতে না পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ধ্বংস হয়ে যাবে। এই দেশই আমার, আপনার, আমাদের সবার শেষ ঠিকানা। এই দেশেই আমাদের জন্ম, এই দেশেই আমাদের মৃত্যু। এই দেশই আমাদের প্রথম ঠিকানা, এই দেশই আমাদের শেষ ঠিকানা। তাই দেশ গড়তে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একযোগে কাজ করতে হবে।”
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু, নোয়াখালী-২ আসনের প্রার্থী জয়নুল আবেদিন ফারুক, ফেনী-২ আসনের প্রার্থী জয়নাল আবেদিন (ভিপি জয়নাল), নোয়াখালী-১ আসনের প্রার্থী মাহবুব উদ্দিন খোকন, লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের প্রার্থী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, ফেনী-১ আসনের প্রার্থী মুন্সী রফিকুল আলম (মজনু)সহ দলের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া–এর বড় সন্তান তারেক রহমান ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “ভোটের দিন যারা তাহাজ্জুদ পড়েন না, তারাও তাহাজ্জুদের সময় ঘুম থেকে উঠবেন। যারা পড়েন, তারা নামাজ শেষ করে সরাসরি ভোটকেন্দ্রে যাবেন। ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে সকাল সাতটার পর ভোটের লাইনে দাঁড়াবেন। ভোট দিয়ে হিসাব বুঝে না নেওয়া পর্যন্ত কেউ ঘরে ফিরবেন না। আগামী দিনের বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে দেশের মানুষের সঠিক সিদ্ধান্তের ওপর।”
ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের ভোটারদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, “এই তিন জেলায় ধানের শীষ বিজয়ী হলে সেটি হবে খালেদা জিয়ার বিজয়।” ফেনীবাসীর দাবির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা হবে। গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসক পাঠিয়ে মা-বোনদের ঘরে ঘরে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
ফেনীর সঙ্গে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, “ফেনী আমার নানার বাড়ি। এখানে চট্টগ্রামের মতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। ফেনীতে ইপিজেড স্থাপন, তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে চাই। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশের ভাগ্য বদলে যাবে।”
বক্তব্য শেষে তিনি ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের বিএনপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট দিয়ে ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “এঁরা নির্বাচিত হলে আপনাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন। এলাকার সমস্যা নিয়ে সরাসরি তাঁদের কাছে যাবেন এবং সমাধানের দাবি জানাবেন।”
জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল ও জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
সন্ধ্যা ৬টা ৩০ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে তারেক রহমান কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা দেন। এর আগে দুপুরে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশ মঞ্চের পাশে গুমের শিকার পরিবার, জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আহত জুলাই যোদ্ধারাও উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার সিলেটে জনসভার মধ্য দিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু করেন তারেক রহমান। পরদিন ঢাকায় সমাবেশ শেষে শনিবার চট্টগ্রাম হয়ে ফেনীতে জনসভায় অংশ নেন তিনি। এরপর কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জে একাধিক জনসভায় অংশ নেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে তার।