একসময় আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া–রাঙ্গাবালী) আসনের নির্বাচনি চিত্র এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় এবং দলটির অংশগ্রহণ না থাকায় দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটের সমীকরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
গত বুধবার প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি মাঠ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে উঠেছে বিএনপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় “ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ” জোটের মধ্যে। পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থীর অংশগ্রহণ ভোটের অঙ্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসন
কলাপাড়া ও নদীবেষ্টিত রাঙ্গাবালী উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসন বরিশাল বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক এলাকা। এখানে অবস্থিত দেশের তৃতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর পায়রা, তিনটি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, শের-ই-বাংলা নৌঘাঁটি, সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন এবং আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটা। ফলে রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও এই আসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭ হাজার ৪৭৩ জন। এর মধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় ২ লাখ ১৩ হাজার ৩১৯ জন এবং রাঙ্গাবালী উপজেলায় ৯৪ হাজার ৫৫৪ জন ভোটার রয়েছেন।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এ বি এম মোশাররফ হোসেন ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে মাঠ গোছানোর কাজ শেষ করেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছে দৃশ্যমান সক্রিয়তা।
তিনি বলেন, ‘ধানের শীষে ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলে পায়রা বন্দর ও কুয়াকাটাকে ঘিরে বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। উপকূলীয় জনপদের মানুষকে আর অবহেলিত থাকতে দেওয়া হবে না।’
বিএনপি নেতাকর্মীদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকের পাশাপাশি ভাসমান ভোটের বড় একটি অংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকতে পারে।
এ আসনে বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান (হাতপাখা)। সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক বিএনপি নেতা হিসেবে তার রয়েছে নিজস্ব ভোটব্যাংক এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা।
গত বছরের ৬ মে দলীয় গ্রুপিংয়ের কারণে বিএনপি ছাড়ার পর ইসলামী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ, কর্মী সমাবেশ ও দাওয়াতি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে নয়, ইসলামী আদর্শ, সুশাসন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন করছি। আমি বিগত বছরগুলো এই জনপদের মানুষের সান্নিধ্যে থেকে তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থেকেছি। তাছাড়া মানুষ পরিবর্তন চায়, আমি সেই পরিবর্তনের প্রতিনিধি হতে চাই।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক বিএনপি ভোটারদের একটি অংশ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর কর্মী-সমর্থক এবং ধর্মপ্রাণ ভোটারদের বড় অংশ ইসলামী আন্দোলনের দিকে ঝুঁকতে পারে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে ১০ দলীয় “ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ” জোট মনোনীত খেলাফত মজলিসের প্রার্থী ডা. জহির উদ্দিন আহমেদকে সমর্থন দিয়েছেন। তিনি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
ডা. জহির উদ্দিন আহমেদ রাঙ্গাবালী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং একসময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নির্বাচনি মাঠে তাকে তুলনামূলক কম সক্রিয় দেখা গেলেও তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক যোগাযোগ ও ভোটার ঐক্য গঠনে কাজ করছেন জোটের নেতাকর্মীরা।
এছাড়াও গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী রবিউল ইসলাম তাদের ট্রাক প্রতীক নিয়ে ব্যাপক ভাবে গণ সংযোগ ও প্রচার-প্রচারণা করে ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছে।
তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফল কার পক্ষে যাবে তা জানার জন্য আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।