রোকুনুজ্জামান, জবি প্রতিনিধি
দীর্ঘ অচলায়তন ভেঙে দেশের প্রধান পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠিত ডাকসু, রাকসু, চাকসু, জাকসু ও জকসু নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি সমসাময়িক ছাত্র রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এবং শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের একটি সুস্পষ্ট দলিল।
ফলাফলের সামগ্রিক ক্যানভাসে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির প্যানেলের নিরঙ্কুশ আধিপত্য দেখা গেলেও, ব্যালট পেপারে শিক্ষার্থীরা প্রমাণ করেছেন তারা অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে সচেতন বিচার-বিবেচনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
নির্বাচনী ফলাফলের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোট ১২৩টি পদের মধ্যে ১০৩টিতেই (৮৩.৭৩%) জয়লাভ করে শিবির প্যানেল ক্যাম্পাসে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তির শক্তিমত্তা জানান দিয়েছে। তবে আস্থার এই চিত্র সব ক্যাম্পাসে একরকম নয়। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চাকসু) শিক্ষার্থীদের রায় ছিল সবচেয়ে একমুখী।
সেখানে ২৬টি পদের মধ্যে ২৪টিতেই (৯২.৩০%) জয়ী হয়ে সংগঠনটি তাদের নিরাপদ ঘাঁটি নিশ্চিত করেছে। এরপরই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাকসু) অবস্থান, যেখানে ২৩টির মধ্যে ২০টি (৮৬.৯৬%) পদ তাদের দখলে। দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডাকসু) ২৮টির মধ্যে ২৩টি (৮২.১৪%) পদ পেয়ে তারা তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করেছে।
তুলনামূলকভাবে জাহাঙ্গীরনগর (জাকসু) এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জকসু) ভিন্নমতের উপস্থিতি লক্ষণীয়। জাকসুতে ৮০% এবং জকসুতে ৭৬.১৯% পদে শিবির জয়ী হলেও, প্রায় ২০-২৪ শতাংশ পদে সাধারণ শিক্ষার্থী বা অন্য প্যানেলের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। যা স্পষ্টত এই দুই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছে।
শীর্ষ পদের মনস্তত্ত্বে ব্যক্তিগত ইমেজ বনাম দলীয় প্রতীক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে লক্ষ্য করা যায়, শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাসের সবচেয়ে বিচিত্র ও পরিণত রূপ দেখা গেছে শীর্ষ তিন পদের (ভিপি, জিএস, এজিএস) নির্বাচনে। এখানে ভোটাররা কোথাও মার্কা আবার কোথাও প্রার্থীর যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
১. ডাকসুর অন্তর্দৃষ্টি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি, জিএস ও এজিএস তিনটি শীর্ষ পদেই শিবির জয়ী হলেও ভোটের পরিসংখ্যানে শিক্ষার্থীদের সূক্ষ্ম বিচারবোধ স্পষ্ট। ভিপি পদে সাদিক কায়েম যেখানে প্রায় ৪৮% (৪৭.৯৯%) ভোট পেয়েছেন, সেখানে জিএস পদে এস এম ফরহাদ পেয়েছেন প্রায় ৩৭% (৩৬.৮৯%) ভোট। একই প্যানেলের হলেও ভিপি ও জিএস প্রার্থীর মধ্যে ভোটের এই ১১ শতাংশ ব্যবধান প্রমাণ করে, ঢাবিতে শিক্ষার্থীরা ঢালাওভাবে প্যানেলে ভোট দেননি; বরং পদের গুরুত্ব ও প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা বিচার করেছেন।
২. রাকসুর বৈপরীত্য: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি পদে মোস্তাকুর রহমান জাহিদ ৬২.৮৪% ভোট পেয়ে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ জনপ্রিয় নেতা হিসেবে রেকর্ড গড়েছেন। অথচ একই প্যানেলের জিএস প্রার্থী ফাহিম রেজা ২৮.৩৭% ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। অর্থাৎ, শিক্ষার্থীরা ভিপি পদে একজনকে বেছে নিলেও জিএস পদে অন্য মতের প্রার্থীকে যোগ্য মনে করেছেন।
৩. জাকসুর উল্টো চিত্র: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটেছে। সেখানে ভিপি পদে শিবিরের প্রার্থী মাত্র ২৯.৮৮% ভোট পেয়ে পরাজিত হলেও, জিএস পদে মাজহারুল ইসলাম ৪৯.১০% ভোট পেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
৪. চাকসুর একমাত্র ক্ষত: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট পদের ৯২ শতাংশ জিতলেও এজিএস পদে তাদের প্রার্থী সাজ্জাত হোছন মুন্না ২৮.৪৮% ভোট পেয়ে পরাজিত হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে, একচেটিয়া আধিপত্যের মধ্যেও শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট পদে যোগ্যতর বিকল্প পেলে তাকেই বেছে নেন।
৫. জকসুর স্থিতিশীলতা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের রায় ছিল সবচেয়ে সুসংহত ও স্থিতিশীল। এখানে ভিপি পদে রিয়াজুল ইসলাম ৫১.১৪% এবং জিএস পদে আব্দুল আলিম আরিফ ৫০.৩৭% ভোট পেয়েছেন। শীর্ষ দুই নেতার প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান ১ শতাংশেরও কম। এটি প্রমাণ করে, জকসুতে শিক্ষার্থীরা ব্যক্তি ইমেজের চেয়ে প্যানেলের ওপর সামগ্রিক আস্থা রেখেছেন এবং তাদের ভোট ব্যাংক অটুট ছিল।
নির্বাচন পরবর্তী বিশ্লেষণে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণ থেকে পরিলক্ষিত হয় যে, এই ফলাফলের মনস্তাত্ত্বিক বার্তাটি খুব গভীর। জকসুতে স্থিতিশীল ভোটব্যাংক দেখা গেলেও, ডাকসুতে ভোটের তারতম্য এবং রাকসু-জাকসুর মিশ্র ফলাফল প্রমাণ করে আধুনিক শিক্ষার্থীরা মার্কার চেয়ে মেধা ও ব্যক্তি ইমেজকে বেশি মূল্যায়ন করেন। তারা নেতৃত্ব নির্বাচনে অনেক বেশি কৌশলী।
তুলনামূলক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সর্বমোট ১২৩টি পদের মধ্যে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেলগুলো ১০৩টি পদে বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। যা মোট পদের ৮৩.৭৩ শতাংশ। বিপরীতে ১৬.২৭ শতাংশ পদ নিশ্চিত করে ২০টি পদে জয় লাভ করেছে ছাত্রদলসহ অন্যান্যরা।
সামগ্রিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯২.৩০% পদে জয়যুক্ত করে শিক্ষার্থীরা শিবির সমর্থিত প্যানেলগুলোর প্রতি সর্বোচ্চ আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। যেখানে ভোটের ব্যালটে ব্যক্তি হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয়তার সমীকরণে এগিয়ে আছেন শিবির প্যানেলের রাকসুর ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ। যিনি এককভাবে কাস্টিং ভোটের ৬২.৮৪% শতাংশ ভোট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়াও, সবচেয়ে স্থিতিশীল ভোটের ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ভিপি ও জিএসের মধ্যে। যার পরিসংখ্যান ভিত্তিক ভোট পার্থক্য মাত্র ০.৭৭%।
প্রাসঙ্গত, দেশের ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১,২৮,৮৪০ জন ভোটারের মধ্যে ৮৫,৯৩৫ জন শিক্ষার্থী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। গড় ভোট পড়ার হার ৬৬.৭১%। ডাকসুতে সর্বোচ্চ ৭৩.৪২% এবং চাকসুতে সর্বনিম্ন ৬৪.৩৯% ভোট কাস্টিং হয়েছে। দীর্ঘ বিরতির পর ব্যালটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের এই সুযোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।