মজনুর রহমান আকাশ, মেহেরপুরঃ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মেহেরপুরের দুটি সংসদীয় আসনে ভোটের মাঠে মূল লড়াই গড়ে উঠছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে। দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে দুই দলের প্রার্থীরা মাঠে সক্রিয়। সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে জমে উঠেছে নির্বাচনী পরিবেশ। মেহেরপুর জেলায় রয়েছে দুটি সংসদীয় আসন। মেহেরপুর-১ (সদর-মুজিবনগর) এবং মেহেরপুর-২ (গাংনী)।
মেহেরপুর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মাসুদ অরুন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্য। জেলা বিএনপির বিগত কমিটির সভাপতি ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মাসুদ অরুনের বাবা প্রয়াত সংসদ সদস্য আহম্মদ আলী ১৯৭৯ সালে বৃহত্তর কুষ্টিয়া-১ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে তিনি মেহেরপুর-১ আসন থেকে ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
জামায়াত ইসলাম অবশ্য আগে ভাগেই তাদের মনোনয় চুড়ান্ত করে। জেলা জামায়াতের আমির তাজউদ্দীন খান জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী। কিন্তু বিএনপির একাধিক নেতা এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইনজীবী কামরুল হাসান, মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাংঘটনিক সম্পাদক রোমানা আহমেদ। তবে মনোনয় যাচাই বাছাইয়ে দলীয় মনোনয়ন না থাকায় বাদ পড়েছেন তারা।
এর বাইরে এনসিপি থেকে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন ঢাকা মহানগর এনসিপির যুগ্ম সম্পাদক সোহেল রানা। যাচাই বাছাই তিনিও বাদ পড়েছেন। বাদ পড়েন অরাজনৈতিক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহাবুব রহমান এবং সিপিবির প্রার্থী আইনজীবী মিজানুর রহমান।
এই আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জেলা সভাপতি আব্দুল হামিদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছে। আসনটিতে জাতীয় পার্টির তেমন কোন প্রচার প্রচারণা বা সভা সমাবেশ হতে দেখা যায়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে এই দুই আসনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরাই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। অন্য দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা থাকলেও ভোটের মূল সমীকরণ ঘুরছে এই দুই দলের মধ্যেই।
গণসংযোগকালে মাসুদ অরুন বলেন, এই আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণই তাদের রায় দেবে। আমি নির্বাচিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেব।
এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী তাজউদ্দীন খান বলেন, মানুষ পরিবর্তন চায়। ন্যায়বিচার, সুশাসন ও ইসলামী মূল্যবোধের রাজনীতির পক্ষে মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, ভোটাররা আমাদের দিকেই তাকাবে।
স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভাষ্য, সদর ও মুজিবনগর এলাকায় দুই দলেরই শক্ত সংগঠন রয়েছে। ফলে এখানে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের প্রচারণার ওপর।
মেহেরপুর-২ আসনের চিত্র
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা নিয়ে গঠিত মেহেরপুর-২ আসনেও নির্বাচনী উত্তাপ কম নয়। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আমজাদ হোসেন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রথমবারের মত সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মনোনয়ন পত্র দাখিলের আগে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদের সঙ্গে বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। তাদের কর্মী সমর্থকেরা একে অপরের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাংচুর চালান। আমজাদ হোসেনের মনোনয়ন প্রত্যাহের দাবিতে টানা এক মাস নানান কমর্সুচী পালন করে জাভেদ মাসুদের অনুসারীরা।
কিন্তু সর্বশেষ আমজাদ হোসেনকেই চুড়ান্ত মনোনীত করে বিএনপি। এই কারণে জাভেদ মাসুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন উত্তোলন করেও দাখিল করেননি।
অন্যদিকে উপজেলা জামায়াতের আমির নাজমুল হুদাকে জামায়াত ইসলামের মনোনয়ন দিয়েছে। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাও তাকে বৈধ ঘোষণা করেছে। এই দুই প্রার্থীর বাইরে জাতীয় পার্টির আব্দুল বাকি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে জাতীয় পার্টির প্রভাব এই এলাকায় খুব কম থাকায় তাকে নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায়নি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গাংনী আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ভোটব্যাংক প্রায় কাছাকাছি। ফলে এই আসনে ভোটের ফলাফল নির্ধারণে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের নির্বাচনী কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে আওয়ামী লীগের ভোটা ব্যাংক টানার চেষ্টা করছেন এই দুই প্রার্থী ।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই আসনে উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা ও ভোটাধিকার ইস্যু প্রধান আলোচনায় রয়েছে। অনেক ভোটারই বলছেন, তাঁরা দল নয়, যোগ্য প্রার্থীকে মূল্যায়ন করতে চান।
আমজাদ হোসেন বলেন, গাংনীর মানুষ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা চায়। আমি দীর্ঘদিন মানুষের পাশে ছিলাম। নির্বাচিত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিখাতে বিশেষ গুরুত্ব দেব।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী নাজমুল হুদা বলেন, এই আসনে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। ভোটাররা যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, তাহলে ফল আমাদের পক্ষে আসবে বলে বিশ্বাস করি।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মেহেরপুরের দুই আসনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভোটব্যাংক কাছাকাছি। ফলে অল্প ব্যবধানেই জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারিত হতে পারে। নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটার উপস্থিতিই হবে চূড়ান্ত ফ্যাক্টর।
নির্বাচনের তারিখ যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মেহেরপুরের রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত ভোটের রায়ে কার ভাগ্যে জয় আসে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গন।