চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আসলাম চৌধুরী হাইকোর্টের দেওয়া শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তার নির্বাচনি মনোনয়ন ঘিরে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রায় এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের দায়ে ১৩টি ব্যাংকের খেলাপি তালিকাভুক্ত হওয়ার পর নিজের মনোনয়ন বাতিল ঠেকাতে তিনি হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছিলেন। আদালত দুই মাসের জন্য তার খেলাপি পরিচয়ের ওপর স্থগিতাদেশ দিলেও শর্ত হিসেবে মোট ঋণের দুই শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫০ কোটি টাকা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর দেওয়া অন্তর্বর্তী আদেশ অনুযায়ী চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারির মধ্যে ওই অর্থ পরিশোধ করে ‘এফিডেভিট অব কমপ্লায়েন্স’ দাখিল করার কথা ছিল। তবে ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মো. আসলাম চৌধুরী ১৩টি ব্যাংকে যে চেক জমা দেন, সেগুলোর কোনোটিই অনার হয়নি। অন্তত পাঁচটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, জমা দেওয়া চেকগুলো বাউন্স হয়ে ফেরত এসেছে।
জনতা ব্যাংকের লালদীঘি শাখার ম্যানেজার সুব্রত দাশ এবং কক্সবাজার অগ্রণী ব্যাংক শাখার ম্যানেজার শাকওতুল আমিন জানিয়েছেন, মঙ্গলবার পর্যন্ত পাওয়া চেকগুলো ডিসঅনার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু অগ্রণী ব্যাংকেই বাউন্স হওয়া টাকার পরিমাণ ২৩ কোটি টাকা। একইভাবে বেসিক ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের চেকও বাউন্স হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব চেক জমা দেওয়া হয় গত ৩০ ডিসেম্বর ও ১ জানুয়ারি। সরকারি ছুটির কারণে রোববার ব্যাংক খোলার পর দেখা যায়, কোথাও পর্যাপ্ত ব্যালান্স নেই, আবার কোথাও কোনো টাকাই জমা ছিল না। এসব কারণে চেকগুলো ফেরত দেওয়া হয়। হাইকোর্টে করা রিটে আসলাম চৌধুরী দাবি করেছিলেন, তাকে জোরপূর্বক ‘ঋণখেলাপি’ বানানো হয়েছে এবং তিনি ইচ্ছাকৃত খেলাপি নন। সেই যুক্তি বিবেচনায় নিয়ে আদালত সাময়িক সুরক্ষা দিলেও শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেই সুরক্ষা এখন ঝুঁকিতে পড়েছে।
১ ডিসেম্বর দেওয়া রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, আবেদনকারীদের নাম বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) রিপোর্টে ডিফল্টার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি দুই মাসের জন্য স্থগিত থাকবে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করে তার প্রমাণ হিসেবে হলফনামা দাখিল করতে হবে। সময়সীমার মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে আলাদা কোনো আদেশ ছাড়াই ওই স্থগিতাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে।
এই রিটের প্রধান আবেদনকারী ছিলেন রাইজিং গ্রুপের চেয়ারম্যান আসলাম চৌধুরী। তার সঙ্গে সেভেনবি অ্যাসোসিয়েটস, সোনালি স্টিল এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড, লার্ক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেড, ফিশ প্রিজার্ভার্স লিমিটেড, কনসেপশন সি ফুডস লিমিটেড ও কনফিডেন্স এডিবল অয়েল লিমিটেডও আবেদনকারী হিসেবে যুক্ত ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আসলাম চৌধুরী স্বীকার করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে কিছু পেমেন্ট আটকে গেছে, ফলে ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত ব্যালান্স ছিল না। তাই চেকগুলো অনার হয়নি, বিষয়টি ইচ্ছাকৃত নয়। তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবারের মধ্যেই আদালতের শর্ত পূরণে প্রয়োজনীয় অর্থ পরিশোধের চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে বিভাগীয় কমিশনার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের রিটার্নিং কর্মকর্তা ড. মো. জিয়াউদ্দীন জানান, গত ৪ জানুয়ারি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ কার্যকর ছিল। সে কারণে তখন মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা ছাড়া তাদের কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ নির্বাচন কমিশনের জন্য বাধ্যতামূলক। এখন নতুন যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়। আদালত যে নির্দেশ দেবে, নির্বাচন কমিশন সেটিই বাস্তবায়ন করবে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তার বিপুল ঋণের পরিমাণ নিয়ে। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী তার ও পরিবারের সদস্যদের হাতে নগদ সম্পদ রয়েছে প্রায় ২০ কোটি টাকা। বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৪৮ লাখ টাকা, আর স্ত্রী ও কন্যার আয় মিলিয়ে ১৯ লাখ টাকার কিছু বেশি। তার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৪৫৬ কোটি টাকা হলেও বিপরীতে তার ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি।