আবু তাহের, জাককানইবি
বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্য-বীর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম শেষে পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন দেশের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বিজয়ের এই দীর্ঘ ৫৪ বছর পেরিয়ে ৫৫ বছরে পদার্পণ করতে যাচ্ছে এবার। দিবসটি উপলক্ষ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন তাদের ভাবনা, অনুভূতি আর প্রত্যাশার কথা-
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী জাকিয়া সুলতানা জানান, ‘১৬ ডিসেম্বর বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন অর্জনের দিন। নয় মাসের দহন, গণহত্যা আর নির্বাসনের উপর দাঁড়ানো এই বিজয় কেবল সামরিক পরাজয় নয়; এটি জাতিসত্তার অদম্য পুনর্ঘোষণা।
চাষির হাত, ছাত্রের স্লোগান, রণাঙ্গনের বীর, শরণার্থী মায়ের হাহাকার—সব মিলেই গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতার রক্তাক্ত মহাকাব্য। প্রতিটি আত্মত্যাগ দেখিয়েছিল, স্বাধীনতা কোনো ঘোষণা নয়,এটি অস্তিত্বের শেষ সীমায় দাঁড়ানো সংকল্প।
বিজয়ের পতাকা ওঠার সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হয়েছিল ক্ষত-বিক্ষত এক ভূখণ্ড, আর তার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অক্ষয় দায়িত্ব: রক্তে লেখা স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষা করা।
তাই ১৬ ডিসেম্বর কেবল উৎসব নয়; এটি কঠোর সতর্কবার্তা,,বিজয় যত কঠিন, রক্ষা তারও কঠিনতর। এটি স্মৃতি নয়, জাগ্রত চেতনা অপরাজেয়, অনমন, অনির্বাণ।’
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জায়েদ আহাম্মদ বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর আমাদের জাতির আত্মপ্রকাশের দিন; যে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে অসংখ্য বীরের ত্যাগে। বিজয় দিবস শুধু অতীত স্মরণ নয়, এটি আমাদের ন্যায়, সমতা ও মানবিকতার পথে চলার প্রেরণা যোগায়। বাঙালি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক চেতনার ভিত এই বিজয়ের মধ্যেই নিহিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, বিজয়ের মূল শিক্ষা হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এবং মানবাধিকার রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকার। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানও এই বিজয়-চেতনার ধারাবাহিকতা যার মূল উদ্দেশ্য ছিলো গণমানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় ও গণতন্ত্রের দাবি বাস্তবায়ন ।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব হলো ইতিহাসকে সত্যভাবে জানা, বৈষম্য ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতন থাকা এবং সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানো। বিজয় দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের মতোই তা রক্ষা করাও একটি চলমান দায়িত্ব।
মহান বিজয় দিবস তাই শুধু জাতীয় গৌরব নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমতার বাংলাদেশ গড়ার অনন্ত আহ্বান।’
নৃবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষার্থী তাসকেরাতুন নূর বর্না জানান, ‘বিজয় দিবস বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে একটি উজ্জ্বল এবং মর্যাদাপূর্ণ দিন। ১৯৭১ সালের ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এই দিনেই বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে মানচিত্রে স্থান পায়।
বিজয় দিবস শুধু একটি দিনের নাম নয়, এটি জাতির মুক্ত আত্মপরিচয়ের জন্মদিন। পাকিস্তানি দমন-পীড়ন, ভাষা-সংগ্রাম, রাজনৈতিক বৈষম্য সব কিছুর বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের পূর্ণতা ঘটে এই দিনে।
এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা অর্জনের কঠিনতম বাস্তবতা,এ স্বাধীনতার অর্জনের পথ সহজ ছিল না। লাখো শহীদ,সম্ভ্রম হারা মা-বোন, এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রামই এই বিজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। বিজয় দিবস জাতীয় ঐক্য, গৌরব, আত্মসম্মান ও দায়িত্ববোধের প্রতীক। এই দিনে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র, পেয়েছি একটি মুক্ত আকাশ যেখানে আমরা প্রাণ খুলে নিঃশ্বাস নিতে পারি।’
মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী মিশাত হাসান বলেন, ‘আজ ১৬ ডিসেম্বর—মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাঁদের ত্যাগে আজকের এই বিজয়। বাঙালি তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এই স্বাধীনতা চিনিয়ে এনেছে। বিজয় দিবস আমাদের দেশপ্রেম, ঐক্য ও দায়িত্ববোধের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আসুন, একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার শপথ নেই।’