সখীপুর, টাংগাইল প্রতিনিধি :
একসময় বাংলার বিয়েতে পালকিতে চড়ে বর যাওয়ার দৃশ্য ছিলো অত্যন্ত গৌরবের। বাঙালি সংস্কৃতিতে পালকি ছিলো সম্মান ও আভিজাত্যের প্রতীক। বিয়ে কিংবা জমিদারদের যাতায়াতে পালকি ছিলো প্রধান বাহন। কিন্তু কালের বিবর্তনে সেই পালকি এখন প্রায় ইতিহাস।
বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই পালকি কখনো চোখে দেখেনি। লোক মুখে অথবা ছবি দেখেছে। তখন বর পালকিতে, আর বরযাত্রীরা পায়ে হেঁটে কনের বাড়ির পথে যেতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতেন এই দৃশ্য।
মোটরগাড়ি ছিলো বিরল। ঘোড়ার গাড়ি, গরু-মহিষের গাড়ি কিংবা সাইকেল ছিলো সাধারণ যাতায়াতের মাধ্যম। ৯০-এর দশকেও বিয়েতে বরের জন্য বাইসাইকেল উপহার দেওয়া ছিলো এক রাজকীয় মর্যাদা। গ্রামের মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসে সেই সাইকেল দেখতেন। অনেকের স্বপ্ন ছিলো একটি বাইসাইকেল কেনার। নতুন দম্পতির মেঠোপথে সাইকেলে শশুরবাড়ি যাওয়া ছিলো মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।
‘হলুদ সন্ধ্যা’য় নারীদের হলুদ শাড়ি পরে কলসি নিয়ে পানি আনতে যাওয়া, কনের সাজে লাল শাড়ি–আলতা–কাচের চুড়ি–টিপ–লেজ ফিতা, বরের গলায় মালা ও লাল পাঞ্জাবি—সব মিলিয়ে ছিলো বাঙালির বিয়ে বাড়ির স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দমেলা।
অতিথিদের আপ্যায়নে কলাপাতায় মোড়ানো গেট, শরবত,বিস্কুট,চানাচুর ছিলো চিরচেনা আয়োজন।
হাতঘড়ি, দেয়ালঘড়ি, কাসার বাসনপত্র ছিলো নিয়মিত উপহার। এমনকি কনের বাড়ি থেকে বাইসাইকেল না দেওয়ায় বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনাও আছে দেশের বিভিন্ন স্থানে।
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বিয়েতে সুকৌশলে যৌতুকের তালিকায় থাকে লাখ টাকা, মোটরসাইকেল ও দামি আসবাব। পালকির পরিবর্তে এখন বরযাত্রীরা আসে প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস বা বাসে করে। শহর–গ্রাম সব জায়গায় বিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনা করছে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান।
সখীপুরের বৃদ্ধা শাহজাহান মিয়া (৮৫) বলেন,
আগে বিয়ে মানেই ছিলো আনন্দ, গান, হাসি–ঠাট্টা আর মানুষের মিলনমেলা। পালকি, সাইকেল, হলুদ সন্ধ্যা—এসব ছিলো আমাদের বিয়ের প্রাণ। এখনকার বিয়েতে জৌলুস আছে ঠিকই, কিন্তু আগের সেই আন্তরিকতা নেই। সবই এখন নিয়ম-নীতির ভেতর বন্দি।
বাঙালির বিয়ে সংস্কৃতির সেই সোনালি দিনগুলো আজ স্মৃতি মাত্র। পরিবর্তনের ঢেউয়ে বদলে গেছে প্রথা, রীতি ও আনন্দের ধরণ, তবুও পুরনো দিনের সরলতা এখনো মানুষের মনে রয়ে গেছে মধুর স্মৃতির মতো।