সাব্বির হোসেন, লালমনিরহাট প্রতিনিধি
নিপাহ ভাইরাস (NiV) হলো এক ধরণের প্যারামিক্সো ভাইরাস যা একটি এনভেলপড ভাইরাস, অর্থাৎ কোভিড-১৯ ভাইরাসের মতোই এর চারপাশে তৈলাক্ত আবরণ থাকে। এটি প্রথম ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়ায় শুকরের মাধ্যমে শনাক্ত হলেও বাংলাদেশে এটি প্রথম ধরা পড়ে ২০০১ সালে মেহেরপুরে।
বাংলাদেশে মূলত বাদুড়ের লালা ও প্রস্রাব দ্বারা দূষিত খেজুরের কাঁচা রস পান করার মাধ্যমেই এই ভাইরাস সংক্রমণ ছড়ায় বলে আইইডিসিআর (IEDCR) প্রমাণ করেছে।
২০০১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশের মোট ৩২টি জেলায় এই ভাইরাসের কেস শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ফরিদপুর (৭১টি), রাজবাড়ী (৩০টি), নওগাঁ (২৫টি) এবং লালমনিরহাট (২৪টি)-তে সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মানুষ থেকে মানুষে এই ভাইরাস সংক্রমিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
নিপাহ ভাইরাস প্রাকৃতিকভাবে বাদুড়ের দেহে থাকলেও তারা নিজেরা আক্রান্ত হয় না, কিন্তু তাদের লালা ও প্রস্রাব থেকে ভাইরাসটি খেজুরের কাঁচা রসে সংক্রমিত হয়ে মানুষের মধ্যে ছড়ায়। কাঁচা রস ছাড়াও বাদুড় বা অন্য প্রাণী/পাখির আধা খাওয়া ফল খেলেও মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।
বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় বাদুড়ের বাসস্থান ও খাদ্যের উৎস নষ্ট হচ্ছে, ফলে তারা কষ্টে থাকায় তাদের দেহ থেকে নিপাহ ভাইরাসের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এমনকি খেজুর রসের জায়গা জাল দিয়ে ঢাকলে বাদুড়কে বেশি পরিশ্রম করতে হয়, যার কারণেও ভাইরাস নিঃসরণের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রধানত মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহ ঘটে। এর সাধারণ উপসর্গগুলো হলো প্রচণ্ড জ্বর, তীব্র মাথা ব্যথা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, মুখ দিয়ে লালা ঝরা, আবোলতাবোল কথা বলা এবং জ্ঞান হারানো।
বাংলাদেশে নতুনভাবে কিছু ক্ষেত্রে কাশির লক্ষণও পাওয়া গেছে, যা মানুষ থেকে মানুষে হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে। খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার পর নিপাহ ভাইরাসের সর্বোচ্চ সুপ্তিকাল হলো ২১ দিন, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই সংক্রমণের লক্ষণ দেখা যায়।
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি অত্যন্ত বেশি; শতকরা ৭১ জন বা আক্রান্তদের দুই-তৃতীয়াংশই মারা যান। এই ভাইরাসের জন্য বর্তমানে কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। আক্রান্তদের মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহের জন্য যে চিকিৎসা দেওয়া হয়, এখানেও একই চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
লক্ষণ দেখা দিলেই দেরি না করে রোগীকে দ্রুত আইসিইউ সুবিধাসম্পন্ন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং সেখানে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা প্রদান করতে হবে।
গবেষকরা বলছেন ৭০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় নিপাহ ভাইরাস নষ্ট হয়। খেজুরের গুড় তৈরির সময় অনেক বেশি তাপমাত্রায় রস জ্বাল দিতে হয়, তাতে ভাইরাস থাকার কোন আশঙ্কা থাকে না। খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে তৈরি পিঠা পায়েসও নিরাপদ।
তবে সঠিক তাপমাত্রায় জ্বাল দিয়ে খেতে হবে।নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের উপায়গুলো হচ্ছে, নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে কাঁচা খেজুরের রস পান করা সম্পূর্ণ নিষেধ এবং এর সংস্পর্শে এলে অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রেখে হাত ধুতে হবে।
মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ এড়াতে হাঁচি-কাশির ক্ষেত্রে মাস্ক পরা ও দূরত্ব বজায় রাখা উচিত। বাদুড় বা অন্য প্রাণীর আধা খাওয়া কোনো ফল খাওয়া যাবে না, এবং যেকোনো ফল-সবজি খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে।
যারা রস সংগ্রহ করেন, তাদের সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে এবং মুখে কাপড় বেঁধে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। সর্বশেষে, কাঁচা রস পান করার ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং ভুল তথ্যে নিরাপদ রস বিক্রির প্রচলন বন্ধ করা আবশ্যক।
নিপাহ ভাইরাসে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ। আইইডিসিআরের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। শীতের সময় খেজুরের রস খেয়ে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। প্রয়োজনে আইইডিসিআর ও স্বাস্থ্য বাতায়ন হটলাইনে যোগাযোগ করে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরামর্শ চিকিৎসকগণ দিয়ে থাকেন।