রোকুনুজ্জামান, জবি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) মার্কেটিং ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ২ নম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার, ফটকের সামনে, শান্ত চত্বরে ও ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যানের দপ্তরের সামনে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঘটনায় উভয় পক্ষের একাধিক শিক্ষার্থী আহত হন।
জানা গেছে, সোমবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রায় ১৫-১৬ জন শিক্ষার্থী মার্কেটিং বিভাগের তিন শিক্ষার্থীর ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে কয়েক দফা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও কয়েকজন শিক্ষক মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসেন। এক পর্যায়ে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দিনের কক্ষে বসে সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সেখানেও উত্তেজনা থামেনি। বিপরীত পক্ষ করিডোরে মুখোমুখি হলে আবার সংঘর্ষ বাধে।
এ বিষয়ে মার্কেটিং বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী সামি উদ্দিন সাজিদ বলেন, “সোমবার সকালে বাসে আমরা গল্প করছিলাম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাদি নামের একজন বারবার ধমক দিচ্ছিলেন। আমরা শুধুই অনুরোধ করেছিলাম, সুন্দরভাবে কথা বলতে। কিন্তু তিনি বিষয়টি বাড়িয়ে ফেলেন। এরপর শুনি তিনি আমাদের খুঁজছেন।”
তিনি আরও বলেন,“মঙ্গলবার তিনি বেশ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে মারধর করেন। আচরণ দেখে মনে হয়েছে, আক্রমণটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল।”
এদিকে ঘটনাটি নিয়ে ক্যাম্পাসে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে, এটি নাকি সাধারণ বিভাগীয় ঘটনা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির বিষয়। কারণ মারামারি থেকে শুরু করে বিচার পর্যন্ত বেশ কিছু বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে যা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, সমঝোতার বৈঠকটি সাধারণ কোনো প্রশাসনিক স্থানে না হয়ে অনুষ্ঠিত হয় অধ্যাপক রইছ উদ্দিনের কক্ষে। সেখানে জবির ১৫-১৬-১৭ ব্যাচের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা প্রবেশ করেন। পরে তারা উচ্চস্বরে চেঁচামেচি করে অন্য শিক্ষার্থীদের বের করে দেয়। রুমে রাখা হয় কেবল আহত শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন শিক্ষককে।
তাই সাধারণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীদের মনে প্রশ্ন উঠেছে-
- দুই বিভাগের বিবাদ নিষ্পত্তি কেন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রুমে করা হলো?
- সিনিয়রদের বের করে রেখে গোপনে সমঝোতার প্রয়োজন পড়লো কেন?
- আর যদি ঘটনা রাজনৈতিক না হয়, ছাত্রদল ঘনিষ্ঠরা সেখানে গেল কীভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে?
এ বিষয়ে জবি ছাত্রদল এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, ঘটনাটিতে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বিবৃতিতে বলা হয়,
“আসসুন্নাহ হলের দুই শিক্ষার্থী বাসে করে আসার পথে নিজেদের মধ্যে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। পরে তা দুই বিভাগের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রদলের নেতারা কেবল ক্যাম্পাসে উপস্থিত থাকায় সমাধানের উদ্যোগে এগিয়ে যান।”
তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, প্রক্টর ও সভাপতিদের উপস্থিতির পরও বারবার সংঘর্ষ, গোপন আলোচনা এবং ভিসির উপস্থিতি, সব মিলিয়ে বিষয়টিতে প্রশাসনের দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন বা ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের দাবি,“সাধারণ মারামারি হলে খোলা জায়গায় অথবা প্রক্টর অফিসের মতো যথাযথ প্রশাসনিক দপ্তরের মাধ্যমে বিচার হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু যখন বিচার হয় কারও ব্যক্তিগত রুমে, যখন সিনিয়রদের বের করে রাখা হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকেও বিষয়টি সমাধানের জন্য ক্যাম্পাসে বিএনপি পন্থি শিক্ষক বলে সমাধিক পরিচিত কোনো শিক্ষকের কক্ষে যেতে হয়, তখন বোঝা যায় ক্ষমতার অঘোষিত প্রভাব কাজ করছে।”
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “এমন পরিবেশে নিরাপদ শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ছাত্র, শিক্ষক, প্রশাসন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় আরো শক্ত হাতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা উচিত।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. তাজাম্মুল হক বলেন, “প্রাথমিকভাবে দুই বিভাগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছিল। পরে তা বড় আকার ধারণ করে। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে, তদন্ত শেষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”