মঈন উদ্দীন,বান্দরবান প্রতিনিধিঃ
সংঘবদ্ধ একটি চক্রের (রোহিঙ্গা সিন্ডিকেট) বিরুদ্ধে বান্দরবানের অন্যতম পর্যটন স্পট প্রান্তিকলেক ও কদুখোলা এলাকায় খাস পতিত পাহাড়, সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও বান্দরবান সীমান্ত লাগোয়া চট্টগ্রামের বনবিভাগের রিজার্ভ ফরেস্টে বিশেষ জাল ও নানা ফাঁদ পেতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, বন্যপ্রাণী শিকার এবং জীবিত বন্দী করে বাইরে পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
ঐ চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে রাতের আধাঁরে অবাধে সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও উক্ত বনবিভাগের রিজার্ভ ফরেস্টের বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছ কেটে পাচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ফলে উক্ত এলাকায় মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল বৃক্ষ ও বনশূন্য হয়ে পড়ছে। এছাড়াও নানা প্রজাতির পশুপাখি শিকারের কারণে এসব পাহাড় ও বনাঞ্চলের বন্যপ্রাণী হারিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫/১০ বছর যাবত চক্রটির কয়েকজন সদস্য প্রান্তিকলেক এলাকায় সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও পতিত খাস পাহাড়ের প্রায় ২০ একরের অধিক জায়গায় সরকারের নিষিদ্ধকৃত পরিবেশ ক্ষতিকর ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ লাগিয়ে ভূমি দখল করে নিয়েছে। স্থাপন করেছে ঘরবাড়িও।
স্থানীয়রা বলেন, এসব পরিবেশ ক্ষতিকর গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। তাদের কৌশল হলো গাছগুলো বড় হয়ে গেলে প্রশাসন ও লোকজনকে বুঝাতে সক্ষম হবে তাঁরা জায়গাগুলোতে দীর্ঘ বছর ধরে ভোগদখলে আছেন এবং বসবাস করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম আইন অনুযায়ী কোন পাহাড়, ভূমি যদি কারও দীর্ঘ দিন বা বছর ভোগদখলে থাকে,
এসব পাহাড়, ভূমি খাস হলেও বসবাস ও চাষাবাদ করতে পারবে। এই সুযোগ কাজে লাগাতে চেষ্টা করছে চক্রটি। বসতি স্থাপন ও বসবাসের সুযোগ নিয়ে এরা বন্যপ্রাণী শিকার, গাছ পাচারসহ বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে।
স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত শনিবার সরেজমিনে সুয়ালক ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ড কদুখোলা ও প্রান্তিকলেকসহ আশপাশের এলাকায় ঘুরে দেখা যায়,
পতিত খাস পাহাড়, বনভূমি, বনাঞ্চল ও কালাইছাখোলা সীমান্ত লাগোয়া চট্টগ্রামের বনবিভাগের রিজার্ভ ফরেস্ট এরিয়ার কাছাকাছি ভিন্ন ভিন্ন স্থানে একাধিক অবৈধ বাড়ি গড়ে উঠেছে।
বাড়ির চারপাশে রয়েছে সরকারের নিষিদ্ধকৃত ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি ছোটবড় গাছ, চারাগাছের একাধিক বাগান। বাড়ির উঠানে হাঁস-মুরগি, গরু, ছাগল দেখা গেলেও বসতঘরগুলো লোকশূন্য অবস্থায় পাওয়া যায়।
স্থানীয় লোকজন বলেন, সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা এসব খাস জায়গায় দখল করে ঘরবাড়ি তৈরি করেছে ও পরিবেশে ক্ষতিকর গাছ বাগানগুলো রোপণ করেছে। আপনাদের (সাংবাদিকদের) উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের লোকজন পাহাড়ে গা-ঢাকা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিগত ৫/১০ বছর আগেও বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক ইউনিয়নের প্রান্তিকলেক, হলোদিয়া, কদুখোলা, ঢাইক্কাখোলা, ভাগ্যকুল, রোয়াইজ্জাখোলা, কালাইছাখোলায় শত শত খাস পাহাড়, বনভূমি ও এই এলাকা সংলগ্ন চট্টগ্রাম বনবিভাগের রিজার্ভ ফরেস্ট ও পাহাড়ের বিস্তীর্ণ এরিয়া জুড়ে ভরপুর গাছপালা এবং বনাঞ্চলে অভয়ারণ্য ছিল পশুপাখি ও নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণীর।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ঐ সংঘবদ্ধ চক্র দিনেদুপুরে ও রাতের আধাঁরে রিজার্ভ ফরেস্টে, বনাঞ্চল থেকে অবাধে কাঠ এবং বন্যপ্রাণী নিধন ও পাচার করে আসছে। এতে বনাঞ্চল উজাড়সহ বন্যপ্রাণী ও তাদের আবাসস্থল ধ্বংসের মুখে পড়েছে।
বনবিভাগ ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় এসব বনাঞ্চলে ময়না, হিল ময়না, টিয়া, রাজধনেশ, দোয়াল, মুতুরা, ঘুঘু, বনপায়রা, সাদাবক, কাক, কোকিলপাখি, শালিক, হরিয়াল, চড়ুই, কুড়াডগ, বনহাঁস, বাজপাখি, কোয়েল পাখি,
চিল, পেঁচা, মাছরাঙা পাখি, ঈগল, কাঠঠোকরা, বুলবুলি, কাঠশালিক, বউকথাকও, পাতিহাঁস, বাবুইসহ প্রায় ৩৫-৪০ প্রজাতির পাখি এবং সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, গয়াল, বুনো গরু, বন ছাগল,
বনরুই, গন্ধগোকুল, বেজি, তক্ষক, ভোঁদড়, চিতাবিড়াল, লজ্জাবতী বানর, মেঘলা চিতা, মার্বেল চিতা, কালো ভালুক, উলু বানর, উল্লুক, লম্বা লেজি শজারু, হলুদ কচ্ছপ, মথুরা, বন মোরগ, বানর, লজ্জাবতী বানর, সজারু, বনশূকর, নেকড়ে বাঘ,
বনশিয়াল, বনকুকুর (রাম কুকুর), কাঠবিড়ালি, বনবিড়াল, অজগর, লাল পান্ডা, ২১ প্রজাতির ইঁদুরসহ বিভিন্ন সরীসৃপ প্রাণী দেখা যেত। কিন্তু ঐ সংঘবদ্ধ চক্র অবাধে শিকার ও বন্দী করে পাচারের কারণে এসব বন্য প্রাণীকুল বিলুপ্তির পথে রয়েছে।
কদুখোলার বাসিন্দা মেজবাহ উদ্দিন বলেন, চক্রটির সদস্যদের নাম বলবো না, বললে আমার সমস্যা হবে। একথা জানিয়ে বলেন, এরা প্রায় সময় জাল, ফাঁদ পেতে বনমোরগ, সাম্বার হরিণ, মায়া হরিণ, বুনো গয়াল, বুনো গরু,
বুনো ছাগল শিকার করে গ্রামেই আসতো ও কেটে মাংস বিক্রি করতো। একটি বনমোরগ ২-৩ হাজার টাকা, হরিণ, বুনো গরু, গয়াল, বুনো ছাগলের মাংস প্রতি কেজি দেড়, দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি করেন।
প্রান্তিকলেক এলাকার মুরুং পাড়ার বাসিন্দা রেংনিং ম্রো বলেন, এই এলাকায় ১২-১৩ জনের সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। চক্রের মূল হোতা সৈয়দ আলম, আব্দুল আলম ও শফিকুল ইসলাম।
এরা বিগত ৮-১০ বছর যাবত এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও সরকারি বনাঞ্চল, পাহাড়, বনভূমি, বনবিভাগের বাগানের গাছ, কাঠ কেটে পাচারের পাশাপাশি পাখি, বিভিন্ন বন্যপ্রাণী হত্যা ও বন্দী করে বিক্রিসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত রয়েছে।
ঢাইক্কাখোলার কৃষক আব্দুল জালাল বলেন, পাখি ও বন্যপ্রাণী শিকারের জন্য চক্রটির কাছে দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র ও জীবিত বন্দী করার জাল, নানারকম ফাঁদ পাতার যন্ত্র রয়েছে।
এরা খুবই হিংস্র প্রকৃতির লোক। স্থানীয়দের সাথে প্রায় সময় ঝগড়া, বিবাদ, মারামারিসহ নানা অপকর্মে জড়ায়। স্থানীয়রা এদের ভয় পায়। তাই সহজে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চায় না।
কদুখোলার বাসিন্দা ছোলিম উল্লাহ বলেন, চক্রটির অধিকাংশ সদস্য মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে অনুপ্রবেশ করে এই এলাকার মানুষের বাগান, চাষাবাদ জমি ও পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে এরা স্থানীয়দের সাথে ছেলে-মেয়ের বিয়ে-সাদী করিয়ে আত্মীয়তার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে শক্তি অর্জন করে ফেলেছে।
এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে, অর্থের বিনিময় ও নানা কৌশলে জাল কাগজ তৈরি করে বাংলাদেশের নাগরিকও হয়ে গেছে এরা।
একই এলাকার কৃষক আব্দুস ছালাম বলেন, পূর্বে যেসব রোহিঙ্গারা এসেছে, এরা কৌশলে ভোটার হয়ে স্থানীয় বাসিন্দা হয়ে গেছে। পুরাতন ও নতুনরা মিলে পার্বত্য বান্দরবান জেলার পাহাড়, বনভূমি দখল করে বসতি স্থাপন, গাছ নিধন ও বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচারসহ নানা অপকর্ম করছে।
পাহাড়, বনভূমি দখল, পাখি, বন্যপ্রাণী শিকার ও কাঠ পাচারের বিষয়টি স্বীকার করে সুয়ালক ইউনিয়নের কদুখোলা ৩নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য রফিকুল আলম জানান, চক্রটির কাছে শিকারী জাল, ফাঁদ পাতার যন্ত্রসহ নানা দেশীয় অস্ত্র রয়েছে।
এরা এতই কৌশলী যে, এসব অস্ত্র পাহাড়, জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে ও মাটিতে বিশেষ কায়দায় গর্তে লুকিয়ে রাখে। রাতের আধাঁরে ও জনমানব শূন্য এলাকায় কাজে লাগায়। অস্ত্র থাকায় স্থানীয়রাও ভয় পায় তাদের।
বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও তাদের কৌশলের কারণে এসব উদ্ধার করা যাচ্ছে না। চক্রটির সদস্যরা পূর্বে রোহিঙ্গা নাগরিক ছিল বলে জানান এই ইউপি সদস্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা সংস্থা এক কর্মকর্তা বলেন, ১৫-২০ বছর আগে এসে যেসব রোহিঙ্গা সুয়ালকসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের বাগান, জমিতে পাহারাদার ও চাষি হিসেবে আশ্রয় নেয়। এই এলাকায় দীর্ঘ বছর থাকার সুবাদে নানা কৌশলে এদেশের নাগরিক হয়ে গেছে।
এরা বন্যপ্রাণী, কাঠ পাচার, চুরি-ডাকাতিসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত থাকার তথ্য রয়েছে আমাদের কাছে। তদন্ত চলমান হলেও বিষয়টি জটিল আকার ধারএ বিষয়ে বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান বলেন, বর্তমানে বন্যহাতি সংরক্ষণের জন্য একটি প্রকল্প চালু রয়েছে।
তবে পাখিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার রোধ ও অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে বনবিভাগ।
বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনী ব্যবস্থা নিতে বনবিভাগ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।