রাব্বিকুল ইসলাম ,দুমকী প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর দুমকীতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে— প্রকৃত অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে স্বচ্ছলদের অস্বচ্ছল দেখিয়ে আবাসনের বরাদ্দ নেওয়া হয২০২২ সালের ৩১ আগস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব আবুল বাকের মো. তৌহিদের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পটুয়াখালী জেলার পাঁচটি উপজেলায় ১৪৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা বা তাঁদের পরিবারের অনুকূলে আবাসন বরাদ্দের প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়।
এর মধ্যে দুমকী উপজেলার ১৮ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত প্রথম ধাপে ১২ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে তালিকার ১–৬ ক্রমিকের মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের (৩য় পর্যায়) ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাদ পড়া ওই ৬ জন মুক্তিযোদ্ধার অনুকূলে বরাদ্দ আসে।
এ লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দরপত্র আহ্বান করেন এবং উপজেলার মুরাদিয়া এলাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স তারিক ব্রাদার্সকে কাজের দায়িতপ্রায় ১ কোটি ১০ লাখ ৬ হাজার ৭৪ টাকার প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০২৪ সালের ১০ জুন প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।
কিন্তু জুলাই আন্দোলনের পর আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা হারালে প্রকল্পে নাটকীয় পরিবর্তন দেখা দপরবর্তীতে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠিতে প্রকৃত অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধারা ঘর পেয়েছেন কি না তা যাচাই করে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এ নির্দেশনার পর স্থানীয় একটি মুক্তিযোদ্ধা সিন্ডিকেট পূর্বের তালিকায় থাকা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানিয়ে প্রভাব খাটিয়ে নতুন করে একটি মনগড়া তালিকাএর ফলেই দেখা দেয় অনিয়ম— ২০২৪ সালের ২৫ নভেম্বর উপজেলা প্রশাসনের পাঠানো প্রতিবেদনে স্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্বচ্ছল এবং অস্বচ্ছলদের স্বচ্ছল দেখানো হয়।
ওই তালিকায় দুইজন সরকারি কর্মকর্তা ও দুইজন মুক্তিযোদ্ধার স্বাক্ষর রয়েএর জেরে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধার ঘর নির্মাণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ঠিকাদার মো. তারিকুল ইসলাম জানান, “প্রশাসনের মৌখিক নির্দেশে ওই ৪ জন মুক্তিযোদ্ধার ঘর নির্মাণ আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পলি করের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি উল্লিখিত মুক্তিযোদ্ধাদের আর্থ–সামাজিক অবস্থা পুনঃযাচাই করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়।
এরপর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৎস্য কর্মকর্তাকে সদস্য করে দুই সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল কযাদের ‘অস্বচ্ছল’ দেখানো হয়েছে তালিকার ১ নম্বরে থাকা বীর মুক্তিযোদ্ধা রহমান আকন— তাঁর দুইটি বাস ও গাড়ি রয়েছে; সেনানিবাস কর্তৃপক্ষ তাঁর নামে থাকা ১ একর জমি ৩ কোটি টাকায় অধিগ্রহণ করেছে৩ নম্বরে সুলতান হাওলাদার, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক; চার ছেলে ও দুই মেয়ে সবাই কর্মরত।
৫ নম্বরে খন্দকার আবদুর রহিম, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা; দুই ছেলে সরকারি চাকরিজীবী।৬ নম্বরে রাজা অলিউল হক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।৭ নম্বরে হোচেন আলী খান, ১ একর খাস জমি বরাদ্দ পেয়েছেন।৮ নম্বরে এস. এম. নূরুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা।
১০ নম্বরে প্রয়াত আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান; সন্তানরা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত১৫ নম্বরে প্রয়াত আব্দুর রাজ্জাক মৃধা, সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন; মেয়ে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। যাদের ‘স্বচ্ছল’ দেখানো হয়ে১৩ নম্বরে আবদুল লতিফ মিয়া, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী; দুই ছেলে সরকারি চাকরিজীবী, নিজে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত, ঘর জরাজীর্ণ।
১৬ নম্বরে সফিজ উদ্দিন খান, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা; চলাচলে অক্ষম, এক ছেলে বেকার, বসবাস করেন ভাঙা টিনের ঘরে।১৭ নম্বরে টি. এম. আহমেদ, দুই স্ত্রী; এক ছেলে সরকারি চাকরিজীবী হলেও ঘরদোর অতি জীর্ণ। ১৮ নম্বরে প্রয়াত ডা. রাজেশ্বর হালদার, স্ত্রী বৃদ্ধ ও চলাচলে অক্ষম; ভাঙা ঘরে বসবাস, ঘরটি রশি দিয়ে গাছের সাথে বাঁধা অবস্থায় রয়েছবীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল লতিফ মিয়া বলেন,
“কিছু মুক্তিযোদ্ধা সাবেক ইউএনও শাহিন মাহমুদের সাথে মিলে আমাদের স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করেন। আমি জানি না কীসে স্বাক্ষর দিয়েছি।”
প্রয়াত রাজেশ্বর হালদারের ছেলে রমেন হালদার বলেন, “ভাঙা ঘরে মা ও স্ত্রীকে নিয়ে কষ্টে আছি। ঘর পেতে তিন শতাংশ জমি বিক্রি করে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। এখন শুনি আমি নাকি স্বচ্ছল!বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিজ উদ্দিন খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,“আমার কাছেও দুই লাখ টাকা চেয়েছিল একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমি বলেছি, ঘুষ দিয়ে ঘর চাই না— ভাঙা ঘরেই থাকবো।”কমিটির সদস্যদের বক্তব্য
তালিকায় স্বাক্ষর করা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহিম বলেন,“আমাকে বলা হয়েছিল শুধু স্বাক্ষর দিতে। আমি জানতাম না আমি কমিটির সদস্য।”অন্য সদস্য আ. মানান হাওলাদার গুরুতর অসুস্থ থাকায় তাঁর মতামত পাওয়া যায়নি। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আলী জানান,“সেই সময় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ইউএনও অফিসে এসে আমাদের স্বাক্ষর করতে বলেন।
সরেজমিন যাচাই তাঁরা করেছেন।উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. অলিউল ইসলাম বলেন,“আমরা সরেজমিন যাচাই করিনি; মুক্তিযোদ্ধারা যাচাই করেছেন, আমরা শুধু স্বাক্ষর করেছি।”উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন,“গত বছরের ২৫ নভেম্বরের তদন্তে কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।