আমিষেই শক্তি – আমিষেই মুক্তি এই প্রতিপাদ্য’র আলোকে সরকার ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান ২০২৫ ঘোষণা করেছে।
৪ অক্টোবর রাত ১২ টার পর হতে ২৫ অক্টোবর ২০২৫ রাত ১২টা পর্যন্ত (১৯ আশ্বিন হতে ১ কার্তিক ১৪৩২ বঙ্গাব্দ) সরকার ঘোষিত এই ২২ দিন সারাদেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুদ, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং দন্ডনীয় অপরাধ ঘোষণা করেছে।
এই আইন অমান্যকারীকে সর্বোচ্চ ২ বছরের সশ্রম কারাদন্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫,০০,০০০/-(পাঁচ লক্ষ) টাকা জরিমানা অথবা উভয় দন্ডে দন্ডিত করা যাবে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে এই নিষেধাজ্ঞা জারির ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন উপকূলীয় জেলা পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা।
জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা জানান, ভরা মৌসুমে নদী ও সাগরে ইলিশ ধরা পড়েনি। খালি হাতে ফিরতে হয়েছে বেশিরভাগ জেলেকে। এবার যখনি নদ-নদী ও সাগরে মোটামুটিভাবে ইলিশের দেখা মিলছে, ঠিক তখনই সরকার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাই সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সময় কিছুটা পরিবর্তনের দাবি করেন তারা।
তারা আরও জানান, প্রতি বছর বাংলাদেশে যখন মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, তখন ভারতীয় জেলেরা বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করে ইলিশ শিকার করে নিয়ে যায়। তাই তারা ভারতের সঙ্গে মিল রেখে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণের দাবি করেন।
গলাচিপার দক্ষিণ পানপট্টি এলাকার সমুদ্রগামী ট্রলারের জেলে এমাদুল শিকদার জানান, গত দুই বছর নিষেধাজ্ঞা পালন করতে গিয়ে তার হাজার হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া এই বছরে ইলিশ শিকার করে যা আয় করছেন তা ঋণ পরিশোধ করে হাতে কিছু থাকছে না। এতে তার সংসারে অভাব ছাড়ছে না।
খরিদা গ্রামের জেলে রিয়াজ জানান, “কিস্তি ও মহাজনের দাদনের (অগ্রিম টাকা নেয়া) বোঝা মাথায় নিয়ে প্রতিনিয়ত আগুনমুখা নদীসহ সাগরের উপকূলে জাল ফেলে আসছি। কোনো দিন খালি হাতে ফিরেছি, আবার কোনো দিন দু-একটা ইলিশ নিয়ে ফিরেছি।
এখন যখন কমবেশি ইলিশ পড়তে শুরু করেছে, শুনেছি সরকার মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এতে করে ধার-দেনা কীভাবে মিটাবো আর নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের খরচইবা কীভাবে জোগাড় করব তা নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছি।”
পানপট্টির নজরুল, মিরাজ হাওলাদার, ইউসুফসহ অনেক জেলেরা অভিযোগ করেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি সাহায্য যা পাই তা আমাদের পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সরকারের সহায়তা যদি পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃদ্ধি করা হতো তাহলে আমরা নিষেধাজ্ঞার সময়ে যথাযথভাবে জীবন-যাপন করতে পারতাম।”
মৎস্য ব্যবসায়ী ইব্রাহিম স্বপন জানান, “গত ২০ বছর ধরে ইলিশের ব্যবসা করে আসছি। এ বছর মাছ তেমন ধরা পড়েনি কিন্তু যখন জেলেদের জালে মোটামুটিভাবে ইলিশ ধরা পড়া শুরু করছে তখনই সরকার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিয়েছে। তবে গত বছর ১২ অক্টোবর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। এ বছর কেন ৪ অক্টোবর দেওয়া হলো তা আমরা বুঝতে পারছি না।
গলাচিপা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহিরুন্নবী জানান, “ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় আগামী ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ২২ দিনের বিশেষ অভিযান চালানো হবে। এ সময় ইলিশ আহরণ, পরিবহন, বিপণন ও মজুত নিষিদ্ধ থাকবে।”
তিনি আরো জানান, “আমাদের গলাচিপা গলাচিপা উপজেলায় প্রায় ২৩ হাজার জেলে রয়েছে। ইতিমধ্যে প্রচার প্রচারণা চালানো হয়েছে, মাইকিং করা হয়েছে, লিফলেট-পোস্টার বিতরণ করা হয়েছে। আমরা জেলে পল্লীগুলোতে সচেতনতা সভা করেছি।
অভিযানের জন্য ইতিমধ্যে নৌবাহিনীর একটি টিম গলাচিপা অবস্থান করছে। উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটির সভা সম্পন্ন হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা কেউ যেন অমান্য করতে না পারে সে জন্য স্পিডবোট, ট্রলারসহ বিভিন্ন ধরণের নৌযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
দিন-রাত ২৪ ঘন্টা গলাচিপার নদ-নদীগুলো গলাচিপা থানা পুলিশের সহযোগিতায় কঠোর নজরদারির মধ্যে রাখা হবে। আর নিষেধাজ্ঞার ২২ দিনের জন্য জেলেকে ২৫ কেজি খাদ্য সহায়তা প্রদান করা হবে।”