বৃহস্পতিবার রাতে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশোতে অংশ নিয়ে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক এমপি নিলুফার চৌধুরী মনি যে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন, তা রাজনীতির মঞ্চে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি বলেছে যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার ফাহাদকে যারা হত্যা করেছে, সেটার নেপথ্যে সরাসরি নড়াচড়া করছে ছাত্রশিবির, যাদের তিনি ‘হেলমেট বাহিনী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই অভিযোগটা শুধু ব্যক্তিগত কটাক্ষ নয়; এটি একটি রাজনৈতিক রূপরেখা নির্দেশ করছে যেখানে ক্ষমতার ছায়ায় এক সংস্থার আগ্রাসী ও সহিংস ভূমিকা নিয়ে খোলাখুলি প্রশ্ন উঠছে।
নিলুফার চৌধুরী মনি টকশোয় আরও জোর দিয়েছেন—বর্তমান সরকারের সুশাসনের উপস্থাপনা ভাসমান কাগজের নৌকার মতো, কারণ তার কথায় সরকার আজ জামায়াত দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন। তিনি যে পরামর্শ দিয়েছেন, তা সরল অভিযোগ নয়; এতে সমগ্র রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও ক্ষমতার জটিলতা চিহ্নিত হচ্ছে—কীভাবে শিক্ষাকেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রাজনৈতিক-আইনজীবী নেটওয়ার্ক, ক্ষমতার ছোঁয়া এবং সংঘর্ষ প্রবণ সাংগঠনিক বাহিনী একযোগে কাজ করে।
ঘটনাটির প্রেক্ষাপট অতীতেও দেখা যায়। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর বুয়েট শেরেবাংলা হল থেকে আবরার ফাহাদের লাশ উদ্ধারের পর থেকে মামলাটি সমাজের চোখে ছিলো এক টেস্ট কেস। তদন্তে বুয়েটের ২৫ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ সেই মামলায় ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয়; এরপর হাইকোর্ট ওই রায় বহাল রেখেছে। আইনগত প্রতিক্রিয়া থাকলেও রাজনৈতিক আঙ্গিকে এই হত্যাকাণ্ডকে কারা বা কোন সংগঠন কাজে লাগিয়েছে—সে প্রশ্ন এখন নতুন করে জনবান্ধব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠছে।
টকশোয় নিলুফার চৌধুরী মনি যে কোর্ট-সংযুক্ত তথ্য ও ব্যক্তিগত দাবিগুলো তুলে ধরেছেন, তা অনুসন্ধান ও প্রমাণের দাবি রাখে। তিনি একই সঙ্গে আসামিদের আইনজীবীদের নাম উল্লেখ করে ইঙ্গিত করেছেন যে বিচার-প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব অথবা সম্পর্কের একটি জটিল চেইন কাজ করছে। এই ধরণের অভিযোগ যে কেবল শব্দের যুদ্ধ নয়, তা স্পষ্ট—এগুলো বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাকে নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে।
এ সময় পুলিশি তদন্ত, আদালত ও রাজনৈতিক দলগুলো যদি বিষয়টিকে কৌশলে নিরপেক্ষভাবে না দেখেন, তাহলে শিক্ষাঙ্গন নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও ছাত্রসমাজের মুক্ত বোধ বিপন্ন হবে। যারা মেধাবী তরুণদের হত্যাকাণ্ডকে রাজনৈতিক বা বাহিনিবদ্ধ সংঘর্ষের অংশ হিসেবে দেখছেন, তাদের জন্য এখন প্রশ্ন আছে—রাষ্ট্র কতটা নিরপেক্ষভাবে এই ঘটনার গোড়া-খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক সশস্ত্রতা অথবা বাহিনীর উপস্থিতি বন্ধ করতে কেন দ্রুত ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না?
আজকের আবহে, আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা শুধু বিচারের বিষয় নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ছাত্ররাজনীতি ও বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতার উপর অভূতপূর্ব প্রভাব ফেলে। নিলুফার চৌধুরী মনির অভিযোগ যদি তদন্তে দাঁড়ায় এবং প্রমাণিত হয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে অশান্তির বীজ বোনা হয়েছে, সেটার দায় ও জবাবদিহি চাইবে—কেবল দণ্ডবিধির আওতায় নয়, রাজনৈতিক সংস্কার ও বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তার কাঠামো পাল্টানোর মাধ্যমে।