ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, প্রশাসনে এখন এক জটিল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী একদলীয় গোষ্ঠী, অন্যদিকে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের পর প্রতিষ্ঠিত আরেক দলীয় গোষ্ঠী—এই দুইয়ের পাশাপাশি আছে নিরপেক্ষ থাকতে চাওয়া একটি ছোট পেশাজীবী গোষ্ঠী। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন এই টানাপোড়েনের ভেতরেই অনুষ্ঠিত হবে।
শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি কার্যালয়ে রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির (আরএফইডি) আয়োজিত নির্বাচনি সংবাদ প্রতিবেদন-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান স্পষ্ট করে দেন, পুরো প্রশাসন একদিনে পাল্টানো সম্ভব নয়। সময় নিয়ে ধাপে ধাপে স্থিতিশীলতা ও পেশাদারি গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, অতীতে গঠিত সংস্কার কমিশনগুলোর বহু সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি, সামান্য কিছু অগ্রগতি হলেও তা যথেষ্ট নয়।
আসন্ন নির্বাচনে সাংবাদিকদের ভূমিকা নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, সাংবাদিকদের ভোটকেন্দ্রে প্রবেশাধিকার অবশ্যই সুরক্ষিত রাখতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের জারি করা গণমাধ্যম নীতিমালা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের অবহিত করার যে শর্ত রাখা হয়েছে, সেটি হয়রানির হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, প্রিসাইডিং অফিসারকে অবহিত করার পর সাংবাদিকদের ছবি, ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হলেও এটি কার্যত তাদের স্বাধীনতাকে খর্ব করছে।
গত ২৩ জুলাই ঘোষিত নীতিমালায় ভোটকক্ষে সরাসরি সম্প্রচার, গোপন কক্ষে ছবি তোলা ও সাক্ষাৎকার নেওয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি একসঙ্গে দুইজনের বেশি সংবাদকর্মী প্রবেশ না করা, সর্বোচ্চ ১০ মিনিট থাকার শর্ত এবং ভেতরে ভোটার বা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারে নিষেধাজ্ঞা—এসবকে ‘গুরুতর বাধা’ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই বাধাগুলো অপসারণ করা জরুরি। তবে তা না হলেও সাংবাদিকদের দায়িত্ব থেকে সরতে পারবে না। কোথায় আইন প্রয়োগ হচ্ছে, কোথায় ভোটারের অধিকার নিশ্চিত হচ্ছে, কোথায় ব্যর্থতা ঘটছে—এসব তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা সাংবাদিকদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
তিনি আরও বলেন, যদি সাংবাদিকরা নিরপেক্ষভাবে সত্য তুলে ধরেন এবং স্বচ্ছতার দাবি অব্যাহত রাখেন, তবে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো যদি সুষ্ঠু নির্বাচন চায় না, তবে কোনো নীতিমালাই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এজন্য পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, টিআইবি প্রধানের এই বক্তব্য কেবল সতর্কবার্তাই নয়, বরং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রশাসনের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা—সবকিছুর জটিল চিত্রকে সামনে নিয়ে এসেছে।